Tuesday, March 26, 2013


দাবি আদায়ের সহজ উপায় ... শফিক রেহমান স্থান: ধানমন্ডিতে বিশিষ্ট ব্যারিস্টার ড. এম আহসানের চেম্বার। চারদিকের দেয়ালে বুকশেলফে চামড়ার বাধানো সব ল রিপোর্ট। ডেস্কে ফাইলের ছোট ছোট পাহাড়। ঘরের এক কোনায় একটা টেবিলে টেলিভিশন। কাল: মার্চ ২০১৩-র প্রথম সপ্তাহ। সন্ধ্যাবেলা। পাত্র: ব্যারিস্টার এম আহসান ও তার পাড়ার ভাইভাই স্টোর্সের মালিক কবির মিয়া। উভয়েই মধ্যবয়সী। সতর্কীকরণ: সকল ঘটনা, চরিত্র ও সংলাপ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কবির মিয়া: (দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে) খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি স্যার। অনেক উকিল-ব্যারিস্টারের কাছে গিয়েছি স্যার। সবাই বললেন, আপনি মুশকিল আহসান ব্যারিস্টার নামে বিখ্যাত। আপনিই স্যার পারবেন আমার মুশকিল আহসান করতে। ব্যারিস্টার এম আহসান (শান্ত মুখে): আমি চেষ্টা করবো। কিন্তু সফল হবো কি না হবো, সেটা মহান আল্লাহতালার হাতে। বলুন, আপনার বিপদটা কি? কবির: আমার উচ্চতা চার ফিট সাড়ে এগার ইঞ্চি। অর্থাৎ, পাচ ফিটের মাত্র আধা ইঞ্চি কম। ব্যারিস্টার: তাতে কি? আপনি তো জীবনে নিজেকে ভালোই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আপনার দোকান থেকে আমার বিবিসাহেব চাল-ডাল, তেল-নুন, পেয়াজ-রশুন, চা-দুধ-সাবান-শ্যাম্পু, মোম-ব্যাটারি সবই কেনেন। আপনার দোকান তো ভালোই চলে। আপনি চার ফিট সাড়ে এগার ইঞ্চি হওয়ায় ব্যবসায়ে তো তার কোনো মন্দ প্রভাব পড়েনি। সমস্যা কোথায়? কবির: সমস্যা স্যার আমার উচ্চতা পাচ ফিট নয়, পাচ ফিটের আধা ইঞ্চি কম। আর এটা স্যার কোনো ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, এটা স্যার এখন আমার জীবন-মরণ সমস্যা। ব্যারিস্টার (কৌতূহলী স্বরে): তার মানে? কবির (নিচু স্বরে): কিছুক্ষণ আগে সংসদে আওয়ামী লীগ সরকার উচ্চতা অপরাধী আইন পাস করেছে। ব্যারিস্টার (বিস্মিত মুখে): উচ্চতা অপরাধী আইন? (তিনি টিভির রিমোট কনট্রোলে টিপলেন।) কবির: হ্যা। স্যার। এই আইনে বিধান করা হয়েছে বাংলাদেশে বসবাসকারী যেসব বাংলাদেশী পুরুষ নাগরিকের দৈহিক উচ্চতা পাচ ফিটের কম তাদের অপরাধী রূপে গণ্য করা হবে এবং তাদের প্রত্যেকের প্রাণদণ্ড হবে। এই প্রাণদণ্ড অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (হঠাৎ হাউমাউ করে কেদে উঠে) স্যার আমার উচ্চতা পাচ ফিটের কম। আমি বাংলাদেশী পুরুষ। আমাকে ফাসির দড়ি থেকে বাচান স্যার। আমাকে বাচান স্যার। ব্যারিস্টার (টিভিতে স্ক্রল নিউজ দেখতে দেখতে): অ্যাবসার্ড। অ্যাবসার্ড। অ্যাবসার্ড। (একটু চুপ থেকে) কিন্তু তারা এটা করতেই পারে। সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মেজরিটি আছে। কবির: মেজরিটি থাকলেই কি তারা আইন করে সূর্যকে চাদ অথবা চাদকে সূর্য বলতে পারবে? সবাইকে ডান হাত নয়Ñ বাম হাতে খেতে নির্দেশ দিতে পারবে? পুরুষদের শাড়ি-ব্লাউজ আর মেয়েদের শার্ট-প্যান্ট পরতে বলবে? ব্যারিস্টার: আওয়ামী লীগ মনে করে তারা পারবে। ক্ষমতায় এসে তারা তো সময়ও বদলে দিয়েছিল। কবির (উত্তেজিত হয়ে): সংসদে মেজরিটি থাকলেই কি এমন আইন পাস করার অধিকার তাদের আছে? আমাদের মৌলিক অধিকার বিষয়ে সংবিধানে যা লেখা আছে, এই আইনটি কি তার বিরোধী নয়? ব্যারিস্টার (বুকশেলফ থেকে বাংলাদেশের সংবিধান বের করে পড়া শুরু করলেন): সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী ... কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (বই থেকে চোখ তুলে) দেখুন, এখানে উচ্চতা বিষয়ে কিছু লেখা নেই। সেই সুযোগটা আওয়ামী লীগ নিয়েছে। তবে নারী-পুরুষে ভেদাভেদ করা হয়েছে, এই আইনে পুরুষদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত নারী ভোটারদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের এই আইনের আওতা থেকে বাদ দিয়েছেন। সে যাই হোক, আইন পাস হয়ে গিয়েছে। এখন আপনাকে কিভাবে বাচানো যায় সেই পথ বের করতে হবে। আপনি কি আপনার উচ্চতার মাপ বিষয়ে একশ ভাগ নিশ্চিত? কবির: হ্যা। আমি নিজে কয়েকবার মেপেছি। বউকে দিয়েও মাপিয়েছি। বাইরে কাউকে বলিনি। তারা হয়তো আমাকে পাচ ফিট উচ্চতারই ভাবে। কিন্তু একবার যদি গোপালী পুলিশের কাছে কেউ রিপোর্ট করে দেয়, তাহলেই আমার জীবন শেষ। ব্যারিস্টার: এ বিষয়ে আর কারো উপদেশ নিয়েছেন কি? কবির: প্রথমে আমি আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, রিং ধরে ঝুলে ব্যায়াম করলে এবং নিয়মিত বাইসাইকেল চালালে হয়তো আধা ইঞ্চি লম্বা আমি হতে পারবো। কিন্তু এতে সময় লাগবে। তারপর আমি গিয়েছিলাম একটি বইয়ের দোকানে। লম্বা হউন এই টাইটেলে বইয়ের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, কোনো ওষুধ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিতে বাড়িতে থেকেই তিন ইঞ্চি থেকে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হওয়া যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতেও সময় সমস্যা আছে। লম্বা হতে সময় লাগবে। তাছাড়া, তাদের এই দাবির প্রতি আমি ভরসা করতে পারি না। ব্যারিস্টার: আপনি এলিফ্যান্ট রোডে কোনো জুতার দোকানে গিয়ে সবচেয়ে উচু হিলের জুতা ট্রাই করতে পারেন। কবির: সেটা ভেবেছিলাম। কিন্তু যে কোনো সময়ে ধরা পড়ে যেতে পারি। বিশেষত নামাজ পড়ার সময়ে। তখন তো জুতা খুলে নামাজ পড়তে হবে। আওয়ামী সরকার তো সব মসজিদের কনট্রোল নিয়ে ফেলেছে। সব মসজিদ গোয়েন্দা নজরে রাখছে। ব্যারিস্টার: বিদেশে পালিয়ে যাবার কথা ভেবেছেন? কবির: হ্যা। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। সব বর্ডারে বিএসএফ খুব কড়া পাহারা দিচ্ছে। স্যার একটা কথা বলতে পারেন? কেন এই আইনটা করা হলো? ব্যারিস্টার: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এক দিকে শেখ মুজিবের বিশাল ইমেজ প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক কর্মসূচি নিয়েছে। অন্যদিকে জিয়ার ইমেজ ধ্বংস করার সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা দেখাতে চাইছে শেখ মুজিব ছিলেন উচ্চতায় বেশি। জিয়া কম। অর্থাৎ, জিয়া ছিলেন ছোট মাপের মানুষ। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে সব ছোট মাপের মানুষকে চিরবিদায় দিতে হবে। আমার ধারণা, এটাই এই আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে এই আইনপ্রণেতারা জানেন না, জিয়ার উচ্চতা প্রায় সাড়ে পাচ ফিট ছিল। তাছাড়া তারা এটাও জানেন না যে বিশ্বের বহু সফল রাষ্ট্রনায়কের উচ্চতা ছিল কম। যেমন ইসরেলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন-এর উচ্চতা ছিল পাচ ফিট। ইনডিয়ার মোহনদাস করমচাদ গান্ধী এবং রাশিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ -এর উচ্চতা ছিল পাচ ফিট তিন ইঞ্চি। কবির (উচু স্বরে): দেখুন, দেখুন, টিভিতে কি দেখাচ্ছে। টিভিতে ভিজুয়াল ও স্ক্রল: সোনারগাও হোটেলের সামনের গোল চত্বরে দ্বিতীয় গণজাগরণ মঞ্চ স্থায়ীভাবে বানানো রয়েছে। সমবেত ব্লগারদের স্লোগান উঠছে। একটা একটা বেটে ধর, সব বেটেকে জবাই কর। বেটেদের বিদায় চাই, বেটেদের ফাসি চাই। ফাসি চাই। ফাসি চাই। টিভির ভিজুয়ালে একজন ব্লগার পিতার কোলে একটি বছর পাচেকের শিশু মেয়ের ইন্টারভিউ নিল টিভি রিপোর্টার। রিপোর্টার: তুমি সব বেটেদের ফাসি চাও? শিশু: হ্যা চাই। রিপোর্টার: কেন ফাসি চাও? শিশু: আব্বু বলেছে, বেটেরা পচা। রিপোর্টার: ঠিক। ঠিক। (শিশুর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দর্শকদের দিকে) এখন দ্বিতীয় গণজাগরণ মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন জনপ্রিয় ব্লগার চাদরবাবা কামরান হোসেন পোদ্দার। তিনি তার বক্তব্য রাখছেন। কামরান (চিৎকার করে কাপা কাপা গলায় নাটকীয় ভঙ্গিতে): ত্রিশ লক্ষ শহীদের বুকের তাজা রক্ত আর দুই লক্ষ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলার মাটি আজ বেটেদের দ্বারা কলংকিত। এই কলংক আমাদের মুছে ফেলতেই হবে। সব বেটেদের ফাসি দিতে হবে। ব্লগার জনতা (সমস্বরে): ফাসি চাই। ফাসি চাই। কামরান: সব বেটেদের জবাই করতে হবে। ব্লগার জনতা: জবাই করো। জবাই করো। কামরান: আমি এই গোল চত্বরের নাম দিলাম লম্বা স্কোয়ার। আপনারা সবাই এটা সমর্থন করেন? হাত তুলে জানান। ব্লগার জনতা (হাত তুলে): লম্বা স্কোয়ার। লম্বা স্কোয়ার। এই সময়ে কিছু খাটো পুরুষ ব্লগারকে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়তে দেখা গেল। টিভি ক্যামেরা অন্যদিকে ফোকাস করলো। কামরান (সিরাজউদদৌলা স্টাইলে): আমি নির্দেশ দিচ্ছি ত্রিশ লক্ষ শহীদের বুকের তাজা রক্ত আর দুই লক্ষ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলার মাটির কলংক মোচনের দৃঢ় প্রত্যয়ে আপনারা সবাই এখন থেকে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা এখানেই থাকবেন। বাংলার মাটি সকল বেটেমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আপনারা এখানেই থাকবেন। আপনাদের জন্য বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ থেকে ফুল প্লেট বিরিয়ানি এবং মিনারাল ওয়াটারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরো অনেক টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা বসছে। এই সার্ক ফোয়ারার নিচে মেশিনের যে বেইসমেন্ট আছে সেখানে পোর্টেবল টয়লেট বসানো হয়েছে। আপনারা এই স্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবেন। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেন না ওঠে আমরা গাজা খাই, সিগারেটের শেষাংশ বাট আর ব্যবহৃত কনডম ফেলে যাই। জয় লম্বা বাংলা। ব্লগার জনতা (সমস্বরে): জয় লম্বা বাংলা। ব্যারিস্টার (এক হাতে কপাল চেপে ধরে): দেশ আজ এমন এক ব্যক্তির খপ্পরে যার চ্যালা চামুণ্ডারা দেশকে আজ লম্বা আর বেটেদের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে। দেশকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। জানি না এই যুদ্ধের পরিণতি কি হবে। তবে নিজের প্রাণ বাচানোর জন্য আপনি একটা চেষ্টা করতে পারেন। (একটা কাগজে রূপসী বাংলা হোটেলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের নাম লিখলেন)। এই অফিসারটির সঙ্গে দেখা করুন। কবির: তারপর? ব্যারিস্টার: উত্তরটা পরে দিচ্ছি। আপনার স্ত্রীর নাম কি? কবির: আকলিমা। ব্যারিস্টার: ওই নামে চলবে না। ওর নাম পালটে ফেলতে হবে। আমি এখনই একটা ডিড পোল করে দিচ্ছি। আপনার স্ত্রীর নতুন স্টাইলিশ নাম হবে ইয়াসমিন কবির। আপনারা দুজনা একটা লিমিটেড কম্পানি করবেন যার নাম হবে টলমার্ক (Tallmark) কম্পানি লিমিটেড। এটাই হবে বাংলাদেশের প্রথম উচ্চতাভিত্তিক কম্পানির নাম। পরে ডেসটিনির মতো কোনো আওয়ামী সমর্থক সাবেক সেক্টর কমান্ডারকে কম্পানির চেয়ারম্যান করবেন। প্রধানমন্ত্রী খুশি হবেন এবং তার বর্তমান নির্দেশক চাদরবাবাও খুশি হবেন। কবির (রুদ্ধশ্বাসে): তারপর? ব্যারিস্টার: টলমার্ক কম্পানির তরফ থেকে আপনারা দুজন দশ হাজার কোটি টাকা লোন নেবেন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ওই শাখা থেকে। বাংলাদেশকে কলংকমুক্ত করার একটি ধাপ হিসেবে এই লোন মঞ্জুর করবে ওই ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়। টাকাটা পেয়েই আপনি সাত হাজার কোটি দান করবেন আওয়ামী লীগের ইলেকশন ফান্ডে। দুই হাজার কোটি দান করবেন চাদরবাবার ফান্ডে বিরিয়ানি ও মিনারাল ওয়াটার সাপ্লাই যেন অব্যাহত থাকে সেই লক্ষ্যে। আর এক হাজার কোটি রাখবেন নিজের জন্য। কবির (কিছুটা সন্দেহের স্বরে): কিন্তু। কিন্তু আমার উচ্চতা তো পাচ ফিটের আধা ইঞ্চি কম থেকেই যাবে। তাহলে আমি বাচবো কি করে? ব্যারিস্টার (স্মিত মুখে কনফিডেন্ট স্বরে): আপনি বাচবেন এবং আরো লোন পাবেন। ভেবে দেখুন আপনার চাইতে অনেক বেশি টাকা শেয়ারবাজার থেকে লুট করেছে দরবেশ। তার কি কিছু হয়েছে? আওয়ামী আমলে বহু অর্থনৈতিক ঘাপলা হয়েছে। কারো কি কিছু হয়েছে? হয়নি। কবির: হলমার্কের তানভীর আর তার স্ত্রী জেসমিন তো জেলে গিয়েছেন। ব্যারিস্টার: তারা একটা ভুল করেছিলেন। তারা মাত্র চার হাজার কোটি টাকা মেরেছেন। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এটা তেমন কোনো বড় এমাউন্ট নয়। তারা আওয়ামী ফান্ডে বেশি টাকা দিতে পারেননি। আপনি শুরু করুন দশ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। তারপর এগোতে থাকেন। ইতিমধ্যে একটি আওয়ামী কোট বানিয়ে ফেলুন এবং সর্বক্ষণ সেটা গায়ে ও চার ইঞ্চি উচ্চতার একটা শাদা কিস্তি টুপি মাথায় পরে থাকুন। আপনার দৃশ্যমান উচ্চতা হবে পাচ ফিট সাড়ে তিন ইঞ্চি। কবির: আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ। ব্যারিস্টার সাহেব, আপনি আমাকে বাচিয়ে দিলেন। আপনাকে কতো ফিস দেব? ব্যারিস্টার (মৃদু হেসে): আগে লোনের টাকাটা আপনার একাউন্টে আসুক। তারপর বলবো আমার ফিস কতো। ৪ মার্চ ২০১৩ শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বিশিষ্ট টিভি অ্যাংকর। facebook.com/ShafikRehmanPresents

তৃতীয় কারো রাষ্ট্রপতি হবার সম্ভাবনা কতটুকু?

আমীন আল রশীদ মো. জিল্লুর রহমানের পরে দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- এ নিয়ে সব মহলেই আলোচনা এবং জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে সেই আলোচনা এখন পর্যন্ত দুজন ব্যক্তিকে ঘিরে। একজন জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, যিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং অন্যজন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এর বাইরে তৃতীয় আর কারোর সম্ভাবনা কতটুকু? যে দুজনকে নিয়ে আলোচনা চলছে, জনমত নিলে তাদের মধ্যে আবদুল হামিদের পক্ষেই বেশি মানুষ বলবেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, যিনি এখনও রাষ্টপ্রতি হবার স্বপ্ন দেখেন, তিনিও গণমাধ্যমে বলেছেন, আবদুল হামিদ যদি রাষ্ট্রপতি হন, সেটিই মঙ্গলজনক হবে। তবে শোনা যাচ্ছে সাজেদা চৌধুরীর পক্ষেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মতামত প্রবল। তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। আর তা হলো জিল্লুর রহমানের পরে যিনিই রাষ্টপ্রতি নির্বাচিত হন না কেন, সংবিধান অনুযায়ী তিনি পরবর্তী পাঁচ বছর স্বীয় পদে থাকবেন, যদি না তিনি স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদ যদি তাকে ইমপিচ বা অভিশংসন না করে। সেক্ষেত্রেও জটিলতা আছে। রাষ্টপ্রতিকে ইমপিচ করতে চাইলে সংসদের দুই তৃতীয়াংশের ভোট লাগবে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, প্রধান দুই দলের নেত্রীদ্বয় যদি একত্রে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন, সেটি সবচেয়ে মঙ্গল। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হকও বঙ্গভবনে গণমাধ্যমকে এ কথা বলেছেন। যদিও সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা মূলত যে কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বড় দুই দলের ঐকমত্য চাচ্ছেন, সেটি হলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবার কথা। সেই নির্বাচন কোন ধরণের সরকারের অধীনে হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। বিরোধী দল স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রথমে যদিও বলেছিল যে, উন্নত দেশে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট তার পদে থাকা অবস্থায়ই নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেরকম হবে। কিন্তু পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন যে, নির্বাচনের আগে তিনি রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দিতে বলবেন এবং নির্বাচন কমিশনকে তফসিল ঘোষণা করার পরামর্শ দেবেন। তার মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি যিনিই হোন না কেন আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তাকে বেশ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি বড় দুই দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তি হন এবং নির্বাচনের আগে যদি তার নেতৃত্বে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যায়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে কারণেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে এবার রাষ্ট্রপতি করা যায়। প্রশ্ন হলো সেরকম ব্যক্তির সংখ্যা কত? সর্বজন শ্রদ্ধেয়, বিতর্কের ঊর্ধ্বে এবং রাষ্ট্রপতি হবার যোগ্যতা আছে, এরকম ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করতে গেলে সেই তালিকা খুব দীর্ঘ হবে না। তবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। যতটা আন্দাজ করা যায় তার ব্যাপারে কেউ আপত্তি তুলবে না। ব্যারিস্টার রফিকুল হকের নামও বলা যায়। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন। কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতিও এই তালিকায় আসতে পারেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একবার শোনা গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিকও রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। কিন্তু বিএনপি তাকে মানবে বলে মনে হয় না। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদকে আওয়ামী লীগ মানবে না। আলাকিত মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকেও সবাই শ্রদ্ধা করেন। যদিও সম্প্রতি তার একটি বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মহাজোটের সংসদ সদস্যরা সংসদে বেশ সমালোচনা করেছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। শিক্ষকদের বাইরে নাগরিক সমাজের মধ্য থেকে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাকে নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নেই। ড. ইউনূসকে নিয়ে অবশ্য খোদ প্রধানমন্ত্রীরই আপত্তি আছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার ইমেজ সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বিএনপি মনে করে তিনি যেহেতু ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যেহেতু হেরে গেছে, তাই দলটি তার সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। তবে এ সবই ধারণা। শেষমেষ হয়তো রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে কেউ একজন, আরও পরিষ্কার করে বললে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ অথবা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মধ্য থেকে কেউ একজনই দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। এটি এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। আমীন আল রশীদ: লেখক ও সাংবাদিক

‘ইন্নালিল্লাহ’ এবং ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি

শওকত মাহমুদ
ভরদুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছি। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যু সংবাদটি প্রথমে দেখলাম ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’ টিভির টিকারে। অর্থাৎ পর্দার নিচে চলমান শিরোনামে, ব্রেকিং নিউজ হিসেবে। চমকে উঠলাম খবরের গুরুত্বে এবং অসম্পূর্ণতায়। সাংবাদিকতার একজন ছাত্র এবং পাঠক হিসেবে আমি খুঁজতে থাকি কবে কখন রাষ্ট্রপতি ইন্তেকাল করেছেন। সিঙ্গাপুরে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সে খবর সবাই জানে। তবে দু’দিন যাবৎ কোনো খবর মিডিয়ায় আসছিল না। কিন্তু মৃত্যু সংবাদে মৃত্যুক্ষণটির উল্লেখ ছিল না। আর ‘ইন্তেকাল’ শব্দটির বদলে ‘মারা গেছেন’ বলা হয়েছে—এতে আমি আশ্চর্য হই না। কেননা ‘মারা গেছেন’ শব্দটি বেশি সহজসাধ্য এবং মান্য বাংলা। কিন্তু কোনো মুসলমান মারা গেলে খবরটির শেষে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’-এ বাক্যটি আমরা সবসময় উল্লেখ করি। কিন্তু সেদিন দেখলাম না। এক টেবিলেই বসা ছিলেন ‘সমকাল’ সম্পাদক সফল সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার। তার মনোযোগ আকর্ষণ করতেই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’সহ কয়েকটি টিভি শোক-সংবাদে ‘ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন’ উল্লেখ করে না। সাংবাদিকতার যা অবস্থা হয়েছে! বাকি টিভিগুলোর নাম তিনি বললেন না, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম বর্তমান সরকারের আমলে লাইসেন্স পাওয়া টিভিগুলো আমাদের এই সর্বমান্য রীতিকে বিসর্জন দিয়ে চলেছে। বলাই বাহুল্য, শাহবাগি জাগরণ নিয়ে এসব টিভি ছিল সোচ্চার।

‘ইন্নালিল্লাহ’ বলতে ইন্ডিপেনডেন্টের নাস্তিকতা শিউরে উঠবে-আমি একথা বিশ্বাস করি না। এর মালিক শ্মশ্রুমণ্ডিত এবং নিশ্চয়ই ধর্মপ্রাণ সালমান রহমান এমন নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন বলে মনে হয় না। কিন্তু দায় তো তারই। বার্তাপ্রধান খালেদ মুহীউদ্দিন বা টিকার-লেখক এ কাজটি আচম্বিতে করেছেন তাও মনে করি না। কিন্তু স্টেশনটির সম্পাদকীয় নীতিতে এটি সাব্যস্ত হয়ে আছে কীভাবে? ‘ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, এ মানুষটি নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য ছিলেন এবং নিশ্চয়ই তাকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

জিল্লুর রহমান ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর কাছেই তিনি ফেরত যাবেন-খোদ জিল্লুর রহমানের আত্মা একথা বলছে। অতএব তিনি আল্লাহর বান্দা ছিলেন, একথাটুকু দিয়ে তার মৃত্যুকে সম্মানিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান রহমানদের কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। রাষ্ট্রপতির ছেলে বেক্সিমকো গ্রুপের একজন অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপতি নিশ্চয়ই বেক্সিমকো গ্রুপকে নানাভাবে সহায়তা করে থাকতে পারেন। আমার মতে, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি বলে পরিচিত এবং শেখ পরিবারের প্রতি রাজনৈতিকভাবে চিরঅনুগত জিল্লুর রহমানের ভালো-মন্দ নিয়ে বলার অনেক কিছু আছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করে দেয়া এবং বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে ফের আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাকে অসম্মানিত করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তার মৃত্যু কবে হয়েছে, ঘোষণায় কোনো বিলম্ব আছে কিনা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী, সরাসরি সম্প্রচারে বিটিভির ব্যর্থতা, সরকারি ছুটির আকস্মিক ঘোষণা এবং শোকের কর্মসূচিতে পরিবর্তনের পেছনে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন জন্ম নিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আর বঙ্গভবনে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দৃশ্যমান উপেক্ষা শেখ হাসিনার জন্য গণনিন্দাই বয়ে এনেছে।

গণমাধ্যমের এই ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘ইন্নালিল্লাহ’ বর্জনের পেছনে রাজনীতি কাজ করেছে বলে সাধারণ মানুষ সংশয় প্রকাশ করতে পারেন। শাহবাগে কতিপয় নাস্তিক ব্লগারের হম্বিতম্বি এবং সাংস্কৃতিক আচরণ বাংলাদেশের মিডিয়াতেও প্রভাব ফেলেছে। আগে বলতাম ‘নিপাত যাক’। ভদ্র ভাষায় যার অর্থ কারও পতন বা বিদায় চাই। এখন বলছে ‘জবাই’। শব্দটি আরবি থেকে যা ইসলামী রীতি-নীতি অনুযায়ী হবে। কিন্তু ডাকাত মানুষের গলা কাটলেও মিডিয়া বলে ফেলে জবাই। মুক্তিযুদ্ধ এবং ইসলামকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানোর অপপ্রয়াস থেকে ওই শব্দের ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার। পাঠ্যবইতে ‘জবাই’ ও ‘বলি’কে কমিউনিস্ট শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একাকার করে ফেলেছেন। অত্যন্ত ভদ্র এই শিক্ষামন্ত্রীর আমলে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি প্রাণ, রক্ত ঝরেছে। সন্ত্রাস সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ক্লাস সবচেয়ে বেশিদিন বন্ধ থেকেছে এবং অনির্বাচিত ভিসিরা রাজত্ব করে গেছেন।

মিডিয়ায় শব্দ বা অভিধা প্রয়োগে সতর্কতা পালন করতে হয়। কেননা, এর ভাষা জনবয়ান গড়ে তোলে, নতুন নতুন শব্দ অভিধানে ঢোকায় এবং অভিধার মধ্যেও রাজনীতি আছে। যেমন জামায়াত-শিবিরের নামের সঙ্গে ‘তাণ্ডব’ তৈরি করেছে এক শ্রেণীর মিডিয়া। গণহত্যায় মেতে ওঠা ‘পুলিশ’ শব্দটির সঙ্গে ‘ঘাতক’ যোগ হয়নি। শাহবাগিরা ছাগল-দাড়ির মতো মানুষজনকে ‘ছাগু’ নামে বলা চালু করেছে। ‘রাজাকার’ মানে দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক।

‘মাদক বা তামুককে না বলুন’ এসব স্লোগানের জন্ম দেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট কট্টরপন্থী রোনাল্ড রিগ্যানের স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যান। তিনি ‘মাদকের বিরুদ্ধে না বলুন’ স্লোগান চালু করেন। পরিবেশবাদী আন্দোলন তথা ‘গাছ লাগান’ আন্দোলনের মূল প্রবতর্ক হিটলার। মানবেতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য এই যুদ্ধাপরাধীর উত্তরণ সুশীল সমাজ থেকে এবং তিনি বুকের দুধ খাওয়ানোর বড় প্রবক্তা ছিলেন। তখন হিটলার করেছেন বলে আমরা কি বাদ দেব? যেমন জামায়াত-শিবিরের সবকিছু পরিত্যাজ্য-এই আন্দোলনের বিষয়ে এক টিভি স্টেশন মালিকের প্রশ্ন-ওরা তো নামাজ পড়ে, তাহলে আমরা কি নামাজ পড়া বাদ দেব? ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ শব্দটা এসেছে মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদ সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে, যারা নিজেদের ‘অ্যাক্টিভিস্ট ফিলোসফার’ হিসেবে দাবি করতেন।

যা হোক, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকা ও ভাষা নিয়ে আজ অনেকেই উদ্বিগ্ন। ২০০৭ সালের শুরুতে কলকাতার বইমেলায় একটা বই বেরিয়েছিল। নাম-সম্প্রচারের ভাষা ও ভঙ্গি। সম্পাদক ভবেশ দাস-আকাশবাণীতে সাংবাদিকতা করেছেন। ‘ভাষার গতি আছে, সে-গতি প্রগতির পথেই চলবে’-এটাই তো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এই ধ্বনিঝঙ্কার ও বাক-বিস্ফোরণে ভাষার দুর্গতি-চিন্তায় (সম্ভবত অধোগতি নয়) অনেকেই উদ্বিগ্ন। বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস ও ভাষার প্রকাশভঙ্গি নিয়ে মন খারাপ করেন কেউ কেউ-এটি সম্পাদকের বক্তব্য।

মন খারাপ করব না কেন, গত শনিবার এক মাওলানা, সরকারের ধর্ম-দিশারী, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এক মহাসমাবেশ ডেকেছিলেন। তাতে কয়েকশ’ লোককে জড়ো থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সরকার-অনুগত ওইসব মিডিয়া লোকসংখ্যা বলল না, মহাসমাবেশ বলেই গেল। আর এ প্রশ্নটি তুলল না যে, রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্যে ওই মাওলানা সাহেব এ কাজটি কেমন করে করলেন? অথচ তখন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চলছিল মরহুম রাষ্ট্রপতির জন্য মিলাদ। সরকারের বিরুদ্ধে অন্য গ্রুপের মুসল্লিরা এমনটি করলে তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারসহ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতারও করা হতো।

সরকার বা আপন বিশ্বাসের লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকতায় নতুন ঘটনা নয়। এক দল বলে, এক ধরনের গণমাধ্যম তাদের বৃত্তিতে যেকোনো ধরনের ইসলামিকতাকে বর্জনে মৌলবাদীদের মতো, আরেক গ্রুপ অতিমাত্রায় ধর্মীয় সত্তার বিস্ফোরণ ঘটাতে চায় অকারণেই। এই দ্বন্দ্ব আজকের নয়। কিন্তু এমন লড়াইয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ পর্যন্ত বর্জন করার প্রবৃত্তি আমাদের আঘাত দেয়। বিবি আয়েশার যুদ্ধের চাইতে জোয়ান অব আর্কের যুদ্ধ রেফারেন্সে বেশি চলে আসে। বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিশালী ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় ওই বইতে ‘খবর বলছি...’ শীর্ষক নিবন্ধে সাংবাদিকতায় সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “১৯৩৬-এর ‘ভারত শাসন আইন’ অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার ভিত্তিতে ১৯৩৭-এর জানুয়ারিতে প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম ভোট থেকে বাংলা কাগজগুলির ভেতরের এসব রাজনীতির সূক্ষ্ম ভাগাভাগি মুছে গেল। সব কাগজই তারস্বরে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িকতার জিভও ছিল সাম্প্রদায়িকতার মতো কাটা। তার এক ডগা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত, আর এক ডগা তফসিলি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত। এই দুই শত্রুর কাছে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ এত তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল যে আগস্ট আন্দোলনের খবরও এসব কাগজে যথেষ্ট কম বেরুত। হিন্দু কাগজগুলির এই সাম্প্রদায়িকতার প্রতিক্রিয়ায় ও মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক স্বাধিকারের আন্দোলনের প্রয়োজনে ‘আজাদ’ ও ‘ইত্তেহাদ’ কাগজ দুটি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার পোষকতা শুরু করে। বাংলা খবরের কাগজে বাঙালি যে বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল, তার জায়গায় নতুন এই বাঙালি বৈশিষ্ট্য এলো-চিৎকৃত সাম্প্রদায়িকতা। ১৯৪০ থেকে প্রায় ১৯৭০ পর্যন্তই এই বিদ্বিষ্ট, চিৎকৃত, বিকারগ্রস্ত ও অপ্রমাণিত সংবাদনির্ভর সাংবাদিকতা বাংলার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।”

আজ বাংলাদেশে কি এমন সাংবাদিকতা হচ্ছে না? যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জাতিতে বিভক্তি, পুলিশের বর্বরতাকে আদুরে সমর্থন, গণতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করে মারার মচ্ছব কি একশ্রেণীর মিডিয়া করছে না? ‘টেলিভিশনে বুদ্ধিজীবী’ নামে প্রবন্ধটি আলোচ্য গ্রন্থে সঙ্কলিত। লেখক প্রদীপ বসু। বলছেন, “প্রকৃত চিন্তা মানুষের মনকে নাড়া দেয়, তাকে ভাবতে বাধ্য করে। টেলিভিশন যে প্রতিযোগিতা ও কর্মপ্রক্রিয়ার মডেল অনুসরণ করে তাতে এরকম হওয়ার কোনো আশা নেই...আমরা সর্বক্ষণ দেখতে পাই টক শো’র হোস্ট, খবর পরিবেশনের অ্যাঙ্কর, ক্রিকেটের বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকার জ্যাঠামশায়ের মতো নীতি উপদেশ দিয়ে চলেছেন। এরা সকলেই হয়ে পড়েছেন দর্শকের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা, মধ্যবিত্ত নৈতিকতার প্রতিনিধি। এরা সকলেই আমাদের বলছেন ‘সামাজিক সমস্যা’ সম্পর্কে আমাদের কী ‘ভাবা উচিত’। আগেই বলেছি এই মানবিক কৌতূহল-জাগানো গল্প, নৈতিক উপদেশ এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি করে। এই গল্পগুলি শুধুমাত্র অরাজনীতিকরণেরই সাহায্য করে না, ঘটনাবলীকে কিসসা বা চুটকির স্তরে নামিয়ে আনে। এইসব গল্পের কোনো রাজনৈতিক পরিণাম থাকে না। কিন্তু এইসব গল্পকে এক নাটকীয় চেহারা দেওয়া হয়। যার থেকে আমরা ‘শিক্ষা নিতে পারি’ অথবা ঘটনাগুলিকে ‘সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে সম্প্রচার করা হয়। এইসব ক্ষেত্রেই আমাদের চটজলদি বুদ্ধিজীবী বা টিভি দার্শনিকদের ডাক পড়ে, যাতে তারা অর্থহীনকে অর্থ প্রদান করতে পারেন, চুটকি কিস্সা যেগুলিকে কৃত্রিমভাবে মঞ্চে আনা হয়েছে তাদের একটা সুসংগত রূপ দিতে পারেন।”

এক ‘ইন্নালিল্লাহ’-এর জন্য হয়তো বেশি বলে ফেললাম। আমাদের চিন্তা-চেতনার জগৎই কেমন সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। সাংবাদিক ক্রিস হেজ তার সুলিখিত বই ‘ডেথ অব দ্য লিবারেল ক্লাস’-এ বলছেন, আমাদের চিন্তন প্রক্রিয়ার, সৃষ্টিশীলতার প্রবাহে বাধা তৈরি হয়েছে মুদ্রন মাধ্যমের বদলে ভিসুয়াল মিডিয়ার (টিভি, কম্পিউটার) আধিক্য বেড়ে যাওয়ায়। ফেসবুকে লিখতে ব্যাকরণ দরকার নেই। পছন্দের সঙ্গীরা হড়হড় করে হাজির হবে। আধুনিকতা মানেই যেন ঐতিহ্য, আবহমান সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলা। টক শো’র পিতৃপ্রতিম আলোচককে আজকের তরুণ হোস্ট ‘জনাব’ ব্যতিরেকে শুধু নাম ধরে সম্বোধন না করলে আধুনিকতা বা আন্তর্জাতিকতাই থাকে না।

মাঝে-মধ্যে ভাবি, আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তা, আলোকিত উপলব্ধি, ব্যাকরণ, নৈতিকতা আর সুস্থ পঠন-পাঠনের কী দুরন্ত গতিধারাই না ছিল। তর্ক-বিতর্ক ছিল, ধর্ম ও আধুনিকতার কী যুক্তিগ্রাহ্য মিশেলই না লক্ষ করেছি। এই ধরুন, একসময় সংবাদপত্রের শোক সংবাদে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কথাটি পুরো লেখা হবে কী হবে না, তা নিয়ে আলেম সমাজ এবং একসময়ের বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক বাংলা’ ও ‘ইত্তেফাক’-এর মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। আলেম সমাজ একসময় মেনে নিয়েছিল, পুরো কথা না লিখে সংক্ষেপে লিখলেও চলবে। কিন্তু সাংবাদিকদের কখনও বলেনি, এটা একদমই লিখব না। কেননা, মূল্যবোধের গভীরতম স্থানগুলো সম্পর্কে সাংবাদিকরা বরাবরই সচেতন এবং মান্য করে এসেছে। কিন্তু আজ? মালিক ও সাংবাদিকদের চরিত্রে এ কোন্ অপছায়া?

শওকত মাহমুদ: প্রখ্যাত সাংবাদিক; মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।