BaBoR
Saturday, October 14, 2017
বাড়ি বানাচ্ছেন, নির্মাণ সামগ্রী সম্পর্কে জানেন তো?
বাড়ী নির্মাণের প্রয়োজনীয় নির্মাণ সামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রয়োজন। কেনার সময় অবশ্যই জিনিসের মান দেখে নেওয়া উচিত। মান সম্পন্ন জিনিস পত্রের দাম কখনও কখনও সাধারনের থেকে একটু বেশী হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ভবন সামগ্রী জীবনে একবারই কেনা হয়। নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ, নির্বাচন ও পরিবহনের কাজটি নিজের হাতে রাখা জরুরি। সঠিক মূল্যে সঠিক জিনিস নির্বাচন একটি বড় গুণ। এতে বাড়ি নির্মাণ ব্যয় যেমন হ্রাস পায় তেমনই নির্মাণ কাজের গুণগত মানও বৃদ্ধি পায়। ভাল মানের সামগ্রী ব্যবহারে আপনি পাবেন ভাল মানের বাড়ী।
প্রধান নির্মাণ সামগ্রীসমূহ হচ্ছে:
পানি
ইট
বালি
সিমেন্ট
খোয়া
রড
কাঁচ
রং, ভার্ণিশ, ডিষ্টেম্পার
মোজাইক
কাঠ
অ্যালুমিনিয়াম এর দরজা/জানালা প্যানেল
পানিবিরোধী পদার্থ
টাইলস্ ইত্যাদি।
পানি
আমাদের জীবনের জন্য পানি যেমন অত্যন্ত জরুরি, তেমনি নির্মাণ কাজে পানির ভূমিকা অপরিসীম।
নির্মাণ কাজে পানি দুইভাবে কাজ করে
১) রাসায়নিক প্রক্রিয়া
পানি সিমেন্টের মধ্যকার পদার্থসমূহকে বিক্রিয়ার জন্য সাহায্য করে। পানি ছাড়া সিমেন্ট বালু ও খোয়ার মধ্যে সংযোগ তৈরি হয় না। পানি সিমেন্টের সেটিং (setting) ও হার্ডেনিঙে (Hardening) সাহায্য করে।
২) ভৌত প্রক্রিয়া
ভৌতভাবে পানি কংক্রিটের কর্ম উপযোগিতা প্রদান করে। এছাড়া পানি দিয়েই কিউরিং করা হয়।
পানি অবশ্যই খাবার উপযোগী হতে হবে।
আয়রনের পরিমাণ বেশি হওয়া চলবে না (সমুদ্রের পানি কাজের অনুপযুক্ত)।
শ্যাওলা/আবর্জনা থাকা চলবে না।
এক ঘনফুট পানির ওজন ৬২.৪ পাউন্ড।
পানি সিমেন্ট এর সাথে বিক্রিয়া করে কংক্রিটকে শক্ত করে। এছাড়া সব পদার্থ একসাথে মিলিয়ে ঢালাই এর যোগ্য বানায়। পানি ততোটাই মেশানো উচিত যতটা দরকার। পারিন সম্ভাব্য কম ব্যবহার কংক্রিটকে অধিক শক্তিশালী করে তোলে।
পানির মাত্রা সম্বন্ধে কিছু কথা: কংক্রিটে পানির প্রয়োজনীয়তা ব্যবহারের সর্বনিম্ন চাহিদা নিশ্চিত করতে পারেল কংক্রিটে অধিক শক্তি অর্জন করা সম্ভব। পানির ব্যবহার কমানোর জন্য ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের এডমিক্সচার ব্যবহার করতে পারেন।
৫ লিটারের একটা টিন জোগাড় করুন। ৫ লিটারের টিন না পেলে ১০ বা ১৫ লিটারের বালতি দিয়ে মিস্ত্রি অথবাঠিচাকারকে বলুন এটা দিয়ে পানি মাপতে । ঢালাই করার সময় একব্যাগ সিমেন্ট ২৩ লিটারের চেয়ে বেশী পানি দেয়া উচিত নয়।
পানির পরিমাণ পরীক্ষণ (ফিল্ড টেস্ট): আপনি নিজেই পানির পরীক্ষা করতে পারেন। মশলা তৈরী হলে তা একটুখানি হাতে নিয়ে টিপে টিপে একটা ছোট বলের আকার দিন। এবার ঐ বলটিকে বাতাসে প্রায় এক মিটার উপরে ছুঁড়ে দিন এবং বলটি হাতে ফিরে আসার পর ভেঙ্গে যায় তার মানে হল মশলাতে পানির পরিমাণ বেশী। তাড়াতাড়ি মশলার পানি কম করুন, অন্যথায় মশলার শক্তি কম হয়ে যাবে। বলটা যদি হাতে গড়ার পরও ঠিক থাকে তাহলে পানির মাত্রা ঠিক আছে। আপনি এবার কাজ শুরু করতে পারেন।
ইট
নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ইট যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভারবহনকারি দেয়াল, পার্টিশন দেয়াল ইত্যাদি তৈরিতে ইট কাজে লাগে। এছাড়া ইট দিয়ে খোয়া তৈরি করা হয়।
তৈরির পXতি অনুসারে ইটকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়
সাধারণ ইট বা বাংলা ইট
সিরামিক ইট বা মেশিনে বানানো ইট
কংক্রিটের তৈরি ইট
সাধারণ ইট বা বাংলা ইট
সাধারণ ইট চার ধরনের হয়-
প্রথম শ্রেণীর ইট
দ্বিতীয় শ্রেণীর ইট
তৃতীয় শ্রেণীর ইট
ঝামা ইট
১. প্রথম শ্রেণীর ইট
প্রথম শেণীর ইট নিম্নলিখিতবৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করে
প্রথম শ্রেণীর ইট একই মাপের হয় এবং রংও একই রকম হয়।
ভালোমত পোড়ানো হয়।
হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলে ধাতব শব্দ হয়।
ইকটি ইট খাড়া অবস্থায় রেখে এর উপর অন্য একটি ইট দিয়ে T এর মতো তৈরি করে ৩.২৮ ফুট বা ১ মিঃ উপর থেকে ফেললে উপরের ইটটি ভাঙ্গবে না।
নখ দিয়ে বা চাবি দিয়ে ইটের গায়ে দাগ বসানো যাবে না।
একটি প্রথম শ্রেণীর ইটের আকার ৯.৫”X ৪.৫” X ২.৭৫”।
একটি প্রথম শ্রেণীর ইটকে ২৪ ঘন্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখলে ইটটি তার ওজনের ১৫% পরিমাণ পানি শোষণ করে।
২. দ্বিতীয় শ্রেণীর ইট
দ্বিতীয় শ্রেণীর ইট নিম্নলিখিতবৈশিষ্টসমূহ ধারণ করে
অনেকটা প্রথম শ্রেণীর মত, ভাল পোড়ানো থাকে তবে একটু বেশি পোড়ানো থাকে।
দুটি ইট পরস্পর আঘাত করলে ধাতব শব্দ হয় না।
২৪ ঘন্টা পানিতে ডুবিয়ে রাখলে এর শুষ্ক ওজনের সর্বোচ্চ ২২% এর বেশি পানি শোষণ করবে না।
ভেঙ্গে ফেলার শক্তি কমপক্ষে ৯০ kg/cm২ হওয়া উচিৎ।
এর আকার আকৃতি এবং রং কিছুটা অসমান এবং ইটের তলা অমসৃণ থাকে।
৩. তৃতীয় শ্রেণীর ইট
এই ধরণের ইট অনেকটা কম পোড়ানো থাকে
সহজে ভেঙ্গে যায় এবং হালকা রংয়ের হয়ে থাকে।
যখন দুটি ইট একে অপরকে আঘাত করে তখন দুর্বল শব্দ হয়।
এর আকার আকৃতি খুবই অসমান থাকে।
২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এর ওজনের সর্বোচ্চ ২৫% এর বেশি পানি শোষণ করবে না।
৪. অধিক পোড়া বা ঝামা ইট
অধিক পোড়ানোর ফলে এই ইট ফাঁপা হয়ে যায় এবং এর আকার এতটাই বিকৃত হয় যে, সাধারণ নির্মাণ কাজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়। এটা সাধারণত খোয়া তৈরিতে ব্যবহার করা হয় যা চুন কংক্রিটের ভিত্তি ও রাস্তার কাজে ব্যবহার করা হয়।
কম পোড়া বা পিলা ইট
কম পোড়া ইটকে সাধারণত পিলা ইট বলে। এগুলো অর্ধেক পোড়া হয় এবং হলদেটে রঙের হয়। এসব ইটের কোন শক্তি থাকে না। তাই এগুলো সুরকি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
ইট ব্যবহারের সতর্কীকরণ নির্দেশিকা
দীর্ঘস্থায়ী নির্মাণ কাজে সব সময় প্রথম শ্রেণীর ইট ব্যবহার করা উচিৎ। পাকা কাজে অথবা বাড়ির প্রাচীর নির্মাণ কাজে বা অস্থায়ী শেড তৈরির কাজে ২য় ও ৩য় শ্রেণীর ইট ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিল্ড বা সাইটে ইট পরীক্ষা
নিচের পরীক্ষাগুলোর সাহায্যে নির্মাণ স্থলে ভাল ইট শনাক্ত করা যেতে পারে। যেমন-
প্রথমে একটি ইট নিয়ে এর পিঠে বা তলাতে নখ দিয়ে আচড় দিয়ে হবে, যদি আচড় পড়ে তবে তা খারাপ ইট বলে বিবেচিত হবে, আর না পড়লে ভাল ইট।
একটি ইট নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে হবে যদি ধাতব শব্দের সৃষ্টি হয় তবে ভাল ইট।
দুটো ইট হাতে নিয়ে T এর মত একটি অপরটির উপর ধরে ১ মিটার উপর থেকে সমান মাটিতে ফেলতে হবে, ভাল ইট হলে উপরের ইটটি ভাঙ্গবে ন্
ইটের ব্যবহার সাধারণত নিম্নরূপ
যে কোন আকৃতির দেয়াল তৈরিতে।
মেঝে বা ফ্লোর তৈরিতে।
আর্চ ও কার্নিশ তৈরিতে।
খোয়া তৈরিতে।
সুরকি তৈরিতে যা সাধারণত চুন প্লাষ্টার বা চুন কংক্রিটে ব্যবহার হয়ে থাকে।
ইটের আকৃতি বা সাইজঃ
বাংলাদেশে পি.ডব্লিউ.ডি সিডিউল অনুযায়ী ইটের সাইজ সাধারণত ৯ ১/২ ইঞ্চি X ৪ ১/২ ইঞ্চি X ২ ৩/৪ ইঞ্চি বা (২৩৮ মিমি X ৭০ মিমি) মাপের বাংলা ইট ব্যবহৃত হয়। আরও অনেক আকৃতির ইট আছে তবে এই আকৃতির ইট সবচেয়ে সুবিধা জনক মর্টারসহ উক্ত সাইজ হয় ১০ ইঞ্চি X ৫ ইঞ্চি X ৩ ইঞ্চি (২৫০ মিমি X ১২৫ মিমি X ৭৫ মিমি)।
সিরামিক ইট
এটি অতি উন্নতমানের প্রথম শ্রেণীর ইটের অন্তর্ভূক্ত। এই প্রকার ইট মেশিনে তৈরি করা হয় বলে আকার ও আকৃতি সঠিক ভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্যাস অথবা বিদ্যুতের সাহায্যে পোড়ানোর ফলে এর রঙের সাম্যতা সর্বত্র বজায় থাকে। ফেয়ার ফেস ব্রিক ওয়ার্কে অর্থাৎ আস্তর করা হবে না এমন দেয়াল নির্মানে এই ইট ব্যবহার করা হয়। সিরামিক ইটে ৫৫% বালি, ৩০% অ্যালুমিনিয়াম, ৮য় আয়রণ অক্সাইড, ৫% ম্যাগনেসিয়া ও ১% জৈব পদার্থ থাকতে পারে।
ব্রিক ওয়ার্ক করা সাধারণত সিরামিক ইট দিয়ে এবং এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে হয়, (বিশেষ করে সিরামিক দিয়ে যারা আগে কাজ করেছে) না হলে ফেয়ার ফেসের সৌন্দর্য নষ্ট হবার সম্ভবনা থাকে।
হলো ব্লক:
বাড়ী নির্মানের হলো ব্লক খুবই উপযোগী। হলো ব্লক ব্যবহারে নিম্নলিখিত সুবিদাদি পাওয়া যায়:
ক) ইটের গাঁথুনির ওজন ৪০ ভাগ কমায় যার ফলে সাশ্রয়ী ডিজাইন সম্ভব হয়।
খ) পরিবেশ বান্ধব।
গ) ঘরের আয়তন প্রতি ১০০ বর্গফুটে ৬-১০ বর্গফুট বৃদ্ধি পায়।
ঘ) দেয়ালে লোনা ধরে না ও জ্যাম হয় না।
ঙ) শব্দ, তাপ, আগুন ও আর্দ্রতা প্রতিরোধক।
চ) সহজে প্লাষ্টার করা যায় এবং এর পুরুত্ব সাধারণ ইটের চেয়ে অর্ধেক হয় (১২মি:মি:-৬মি:মি)
ছ) ইলেকট্রিক্যাল ও প্লাম্বিং এর কাজে সহায়ক।
বালি
নির্মাণ কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বালি, যা সিলিকা থেকে তৈরি হয়। বেশির ভাগ সময় সমুদ্র বা নদীর উপক’লে, সমুদ্রের তলায়, নদীয় তলায় বালি পাওয়া যায়।
বালিকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়
পিট বালি
নদীর বালি
সমুদ্রের বালি
পিট বালি
মাটিতে গর্ত করে এই প্রকার বালি পাওয়া যায়। যা মসৃণ, কোণাকার এবং ক্ষতিকারক লবণ থেকে মুক্ত থাকে। এই প্রকার বালি সাধারণত মর্টারের কাজে ব্যবহৃত হয়।
নদীর বালি
এই প্রকার বালি নদীর উপকূলে পাওয়া যায়। যা চিকন ও গোলাকার হয়ে থাকে। এটা পিট বালি অপেক্ষা সূক্ষ্ম তাই প্লাষ্টারিং এর কাজ এই বালি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সমুদ্র বালি
এই প্রকার বালি সমুদ্রের উপকূলে পাওয়া যায়। যা নদীর বালির মত চিকন ও গোলাকার হয়ে থাকে। তবে এই প্রকার বালিতে ক্ষতিকারক লবণ থাকে।
মোটা দানার বালি
এই প্রকার বালির দানা তুলনামূলক একটু বড় আকৃতির হয় তাই নির্মাণ কাজে ঢালাইয়ের সময় খুবই উপযোগী। কংক্রিট তৈরিতে সিলেট বালি সমান থাকে।
বালি ব্যবহারে সতর্কীকরণ
বালির সঙ্গে কোন প্রকার ময়লা, কাদামাটি থাকতে পারবে না। লবণাক্ত বালি ব্যবহার করা যাবে না এবং নির্মাণ কাজের পূর্বে বালি ভালভাবে ধুয়ে নিতে হবে যেন বালির সালে সংযুক্ত কাদা, লবণ, ময়লা, আগাছা, ডালপালা, নুড়ি বের হয়ে যায়।
বালি পরীক্ষা
বালির গুণাবলী পরীক্ষার জন্য নিম্নলিখিতপরীক্ষাগুলো করা প্রয়োজন
কিছু বালি দুআঙ্গুলের ফাঁকে নিয়ে ঘষা দিতে হবে, যদি আঙ্গুলের সাথে ধুলা জাতীয় দ্রব্য লেগে থাকে, তবে বুঝতে হবে বালির সাথে ধুলা রয়েছে।
মুখ নিয়েও বালি পরীক্ষা করা যায়। একটু বালি মুখে নিয়ে বোঝা যাবে এর মাঝে লবণ জাতীয় পদার্থ আছে কিনা।
একটি পরিষ্কার কাঁচের গ্লাসে পানি নিয়ে তার মাঝে কিছু বালি ছেড়ে দিতে হবে এবং কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। যদি বালিতে ধুলা থাকে তবে তার স্তর বালির উপরে হবে।
কিছু পরিমাণ কষ্কিক সোডা ৩% একটি বোতলে নিয়ে তার সাথে অল্প কিছু বালি যোগ করে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে এবং কিছুক্ষণ ঝাকাতে হবে এবং ২৪ ঘন্টা ঐ অবস্থায় রেখে দিতে হবে। যদি বোতলে রক্ষিত দ্রব্যের রং পরিবর্তন হয়ে বাদামী হয়, তবে বুঝতে হবে বালিতে রাসায়নিক পদার্থ বিদ্যমান।
বালু তীক্ষ্ম নজর দিয়ে দেখলে যদি এতে পাথর, কয়লার টুকরা বা অন্য কোন নোংরা থাকে তাহলে ব্যবহারে না নেওয়াই ভালো। আরেকটা উপায় হল, একটা কাঁচের গ্লাসে আধা গ্লাস বালু নিয়ে বাকিটা পানি দিয়ে ভরে দিন এবং একটা চামচ দিয়ে ভাল করে নেড়ে নিন। বালুতে নোংরা থাকলে পানির রং ময়লা বা ঘোলা হয়ে যাবে। বালুটা নীচে বসে যাওয়ার পর দেখুন যদি বালুর ওপর মাটির স্তর বেশী মোটা হয় তাহলে এ বালু ব্যবহার করার দরকার নেই। যদি ভুল ক্রমে এমন বালু এসে যায় এবং পরীক্ষার পরে ব্যবহারযোগ্য মনে না হয় তাহলে ও চিন্তার কোন কারণ নেই, এমন বালুকে পরিস্কার করারও উপায় আছে।
বালুকে ধুয়ে পরিস্কার করা যায়: বালুর গাদায় পানি ঢেলে দিন তাতে করে ময়লা মাটি নীচে বসে যাবে। এবার কোদাল দিয়ে বালুটাকে ভাল করে মিশিয়ে নিন তারপর চালনি দিয়ে ছেঁকে নিন। বালু পরিস্কার হয়ে যাবে।
ভেজাল বালু ব্যবহারে অসুবিদা হতে পারে: শ্রমিকেরা মশলাতে বেশী পানি মেশানো পছন্দ করে। যদি প্রথম থেকেই বালুতে পানি বেশী থাকে তাহলে, সেই বালু ব্যবহারে নির্মাণ কমজোর হতে পারে। তাই যদি দেখেন বালু ভেজা তবে ঠিকাদারকে বলবেন ইঞ্জিনিয়ার এর পরামর্শ মতে পানি মেশাতে।
প্রচলিত ভাবে বালি তিন প্রকার
ভিটি বালি: ভিটি বালু-র এফ এম ০.৫ থেকে ০.৭। ভরাট কাজে ব্যবহৃত হয়।
লোকাল বালি: এর এফ এম ১.২ থেকে ১.৮। গাঁথুনি, প্লাস্টারিং এর কাজে ব্যবহৃত হয়।
মোটা বালি: মোটা বালু সিলেটে অধিক পাওয়া যায়। এর এফ এম ২.৩ থেকে ২.৮। ঢালাই এর কাজে ব্যবহৃত হয়।
গোলাকার বালু অপেক্ষা কোণাকার বালু ভাল । ঢালাইয়ের কাজে মোটা বালুই ভাল। বালুকে বলা হয় ফাইন এগ্রিগেট। বালু পরিস্কার ও কাদা মুক্ত হওয়া উচিত।
সিমেন্ট
নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে সিমেন্ট। সিমেন্টের মধ্যে কোন কোন উপাদান আছে তা ব্যবহারকারীর জানা খুবই জরুরী। বিভিন্ন ধরনের সিমেন্ট আছে বাজারে। একেক ধরনের সিমেন্ট ব্যবহারে একেক ধরনের সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। সিমেন্ট একটা সংযোগকারী পদার্থ (Binding Material)। কংক্রিট, মর্টার বা মসল্লা, প্লাষ্টার ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে বালি এবং খোয়ার সংযোগ ঘটায় সিমেন্ট। সিমেন্ট ঠিক মত বাছাই করতে পারলে স্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী শক্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। অতএব, ভাল নির্মাণ কাজের জন্য ভাল সিমেন্ট প্রয়োজন।
সিমেন্ট কেনার আগে কি যাচাই বাছাই করা উচিত?
কোন অনুমোদিত বিক্রেতার নিকট থেকে গুনগত মানসম্পন্ন সিমেন্টই কেনা উচিত। হয়ত সেক্ষেত্রে দাম একটু বেশী হবে কিন্তু সাথে সাথে বিশ্বাস, মান এবং সুরক্ষায় আশ্বাস ও পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে মেরামতের জন্য অধিক অর্থ ব্যয় করার চেয়ে বর্তমানেই একটু বেশী অর্থ ব্যয় করা কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? আমরা বাড়ীর রং, ফিটিংস পছন্দ না হলে বদলাতে পারি কিন্তু মূল স্থাপনায় সিমেন্ট একবার ব্যবহৃত হওয়ার পর আর কখনও বদলানো যাবে না, অতএব সতর্ক থাকুন। সিমেন্ট নির্মাণ কার্যের এক গুরুত্বপূর্ন উপাদান, যা পুরো বাড়ীটিকে ধরে রাখে।
ডিউরেব্ল কংক্রিট এর প্রপার্টিজ
ক্লোরাইড ও সালফেট প্রতিরোধী
স্বল্প পারমিয়েবল
কম পোরোসিটি
স্বল্প পানির চাহিদা
স্বল্প ব্লিডিং ও সেগ্রিগেশন
হাইড্রেশন বিক্রিয়ায় কম তাপ
দীর্ঘমেয়াদী শক্তি বৃদ্ধি
ভাল সিমেন্টের গুণাগুণ:
দীর্ঘকালীন শক্তি এবং টেকসই নির্মাণ।
মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনে অপেক্ষাকৃত কম খরচ।
তাপের তারতম্য জনিত কারনে সৃষ্ট ফাটল প্রতিরোধ করে।
মাটি, পানি এবং বাতাসে বিদ্যমান ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থের আক্রমন প্রতিরোধ করে।
লোহাকে মরিচা ধরার হাত থেকে রক্ষা করে।
কম সংকুচিত হয়
সুন্দর ও সমৃণ ফিনিশিং
কংক্রিট মিশ্রনে কম পানির দরকার হয়।
পরিবশে বান্ধব।
ভমিকম্প প্রতিরোধক ডিজাইনের পক্ষে উপযোগী।
ক্ষতিকারক রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রতিরোধী।
সিমেন্টর যাচাই: ধরুন আপনার সিমেন্টের মানের উপর সন্দেহ হচ্ছে, আপনার আশংকা সিমেন্টেটা খারাপ। তখন আপনি কি করবেন? যদি নিশ্চিত হতে চান তাহলে নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করে নিন।
একটু সিমেন্ট নিন, সিমেন্টের পরিমাণ ২৫-৩০ শতাংশ পানি মিলিয়ে ৫০ল্প৫০ল্প২০ মিলিমিটার আকারে ব্লক বানান। পরের দিন সকালে সিমেন্ট জমে যাওয়ার পর আঙ্গুল দিয়ে টিপে দিলে ব্লকগুলো যদি না ভাঙ্গে তার মানে ভাল সিমেন্ট।
বাংলাদেশ নিম্নলিখিতচার ধরনের সিমেন্ট পাওয়া যায়
১.সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট
২.হোয়াইট সিমেন্ট
৩.পোর্টল্যান্ড প্রজ্জোলনা বা ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্ট
৪.ব্লাষ্ট ফার্নেস স্ল্যাগ সিমেন্ট
বাংলাদেশ প্রায় ৯৮% সিমেন্ট তৈরি হয় মধ্যবর্তী পণ্য অর্থাৎ কিংকার থেকে।
কাঁচামাল- ক্লিংকার অর্থাৎ প্রথম ধাপ যা তৈরি হয় বাংলাদেশের বাইরে।
ক্লিংকার- সিমেন্ট অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপ যা বাংলাদেশে তৈরি হয়।
ক্লিংকারে চুন থাকে প্রায় শতকরা আটষট্টি ভাগ, এছাড়া বালি, লোহা, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি বিভিন্ন অনুপাতে থাকে।
ক্লিংকার ও জিপসামের অনুপাতঃ
সিমেন্ট জিপসাম যোগ করা হয় যাতে সিমেন্ট জমাট বাঁধতে দেরি করে এবং কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়। ক্লিংকার অ্যালূমিনা পরিমানে বেশি থাকলে সিমেন্ট দ্রুত জমাট বাঁধে। সিমেন্ট জিপসামের পরিমাণ নির্ভর করে C3A (ট্রাই ক্যালসিয়াম অ্যালুমিনেট) এবং ক্ষারীয় পদার্থের পরিমানের উপর। সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ক্লিংকার থাকে >=৯৭% এবং জিপসাম =<০৩%। অন্য ধরনের সিমেন্টগুলোতে জিপসামের পরিমাণ =<০৩% হলেও ক্লিংকারের পরিমাণ বিভিন্ন অনুপাতে হয়।
জিপসামের পরিমাণ বেশি হলে সিমেন্টপেষ্টের আয়তন বেড়ে যায় এবং বন্ধনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
সিমেন্টের প্রাথমিক জমাট বাঁধার সময় কমপক্ষে ৪৫ মিনিট।
সিমেন্টের শেষ জমাট বাঁধার সময় সর্বোচ্চ ১০ ঘন্টা।
বাংলাদেশে সাধারণত যে চার ধরনের সিমেন্ট বেশি ব্যবহৃত হয় সে সব সিমেন্টের উপাদানসমূহ, ষ্ট্রান্ডার্ড নাম্বার এবং ব্যবহার সংক্ষিপ্ততভাবে নিচে বর্ণনা করা হলো:
১. সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট
সিমেন্ট ইতিহাসের প্রথম থেকেই এক প্রকার সিমেন্ট তেরি হয়ে আসছে এবং কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই প্রকার সিমেন্টই সমস্ত নির্মাণ কাজে ব্যবহার হতো।
উপাদান
ক্লিংকার >=৯৭% এবং জিপসাম =<০৩%
ষ্ট্যান্ডার্ড
ASTM (আমেরিকান সোসাইট ফর টেষ্টিং এন্ড মেটেরিয়ালস্) : C ১৫০-০২
BDS (বাংলাদেশ ষ্ট্যান্ডার্ড) : ২৩২-১৯৯৩
EN (ইউরোপিয়ান নর্ম) : ১৯৭-১:২০০০ CEMI
ব্যবহার
সবধরনের কাজের জন্য এই সিমেন্ট ব্যবহার করা যায়। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এই ধরনের সিমেন্ট ছিল আমাদের দেশের একমাত্র সিমেন্ট। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও কাজের ধরন অনুযায়ী সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ভারী নির্মাণ কাজে এখন আর সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় না। কারণ এই সিমেন্ট পানির সঙ্গে মিশালে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় যা ভারি নির্মাণ কাজের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু মাঝারি আকৃতির নির্মাণ কাজের জন্য এই সিমেন্ট অত্যন্ত উপযোগী।
২. পোর্টল্যান্ড প্রজ্জোলনা বা ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্ট
সিমেন্টের প্রধান উপকরণ হলো ক্লিংকার আর এই ক্লিংকারের প্রধান উপকরণ চুনাপাথর। চুনাপাথর পানির সাথে বিক্রিয়া করে প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে যা ভারি এবং বিশাল আয়তনের নির্মাণ কাজের জন্য ক্ষতিকর। তাপ বেশি উৎপন্ন হলে ঢালাইয়ের পর স্থাপনাতে চুলের মতো সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেয়, যা Hard crack নামে পরিচিত। বর্তমানে এই সমস্যা দূর করার জন্য সিমেন্টে ক্লিংকারে পরিমাণ কমিয়ে তার জায়গায় কয়লা চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বাই প্রোডাক্ট হিসাবে যে পোড়ানো কয়লা পাওয়া যায় তা ব্যবহার করা হয়। এই পোড়ানো কয়লা ফ্লাই অ্যাশ নামে পরিচিত। ফ্লাই অ্যাশের কণা ক্লিংকারের কণা বিকল্প হিসাবে এই ধরণের সিমেন্ট ফ্লাই অ্যাশ ব্যবহার করা হয় তাই এই সিমেন্টকে পোর্টল্যান্ড প্রজ্জোলনা বা ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্ট বলে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য
ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্ট ঢালাইয়ের সময় খুব কম তাপ উৎপাদন করে, ফলে ঢালাই শক্ত হওয়ার পরে hair crack এর প্রবণতা কমে যায়। এ ছাড়া এই ধরনের সিমেন্ট সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট অপেক্ষা বেশি শক্তি প্রদান করে। তবে এর প্রাথমিক শক্তি অর্জনের হার সাধারন পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট অপেক্ষা কম থাকে।
উপাদান
ক্লিংকার = ৮৪-৮৬%, ফ্লাই অ্যাশ=১১-১৩% এবং জিপসাম =<০৩%
ষ্ট্যান্ডার্ড
ASTM (আমেরিকান সোসাইট ফর টেষ্টিং এন্ড মেটেরিয়ালস্) : Type IP ৫৯৫-০২
BDS-EN (বাংলাদেশ ষ্ট্যান্ডার্ড-ইউরোপিয়ান নর্ম) : EN১৯৭-১:২০০০ CEMI II / (I-M) ৪২.৫N
ব্যবহার
ভারি কন্সট্রাকশন কাজে যেখানে একসাথে প্রচুর সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হবার সম্ভাবনা থাকে। লোনা পানির আবহাওয়াতে, মাটির নিচের কাজে, পানির নিচে বা পানির সংস্পর্শে থাকে এমন স্থাপনাতে।
উল্লেখ্য যে যুক্তরাষ্ট্রে হেবিটি উঅগ যা বিশ্বের বৃহত্তম উঅগ এই প্রকার সিমেন্টের তৈরি।
৩. ব্লাষ্ট ফার্মেস স্লাগ সিমেন্ট
বর্তমান সময়ে সিমেন্ট ক্লিংকারের অনুপাত কমিয়ে তার বদলে বিভিন্ন ধরনের সমধর্মী উপাদান মেশানো হয়। সেরূপ একটি সমধর্মী উপাদন হলো ‘স্লাগ। ইস্পাত কারখানা থেকে উৎপাদিত এক প্রকার বাই প্রোডাক্ট হচ্ছে স্লাগ। এই ব্লাষ্ট ফার্নেস স্লাগ সিমেন্ট এবং কার্যকারিতা OPC সিমেন্টের মতই বরং এটি কম তাপ উৎপন্ন করে এবং লবণাক্ত আবহাওয়াতে এই সিমেন্ট সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট থেকে বেশী কার্যকরী। এই সিমেন্ট স্থাপনাকে বাতাসের সালফারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট এর তুলনায় যদিও প্রথম দিকে এর শক্তি অর্জনের হার কম কিন্তু পরবর্তীতে স্লাগ সিমেন্ট OPC সিমেন্ট থেকে প্রায় দেড় গুণ শক্তি বেশি অর্জন করে থাকে।
উপাদান
ক্লিংকার =৭০-৭৫%, ব্লাষ্ট ফার্নেস স্লাগ =২০-২৫% এবং জিপসাম =<০৫%
ষ্ট্যান্ডার্ড
ASTM (আমেরিকান সোসাইট ফর টেষ্টিং এন্ড মেটেরিয়ালস্) : ঈ ৫৯৫-০২
BDS-EN (বাংলাদেশ ষ্ট্যান্ডার্ড-ইউরোপিয়ান নর্ম) : EN১৯৭-১:২০০০ CEM II /ই-গ (ঝ-খ) ৪২.৫ঘ
ব্যবহার
ভারি কন্সট্রাকশন কাজে যেখানে একসাথে প্রচুর সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হবার সম্ভবনা থকে। লোনা পানির আবহাওয়াতে, মাটির নিচের কাজে, পানির নিচে বা পানির সংস্পর্শে থাকে এমন স্থাপনাতে।
৪. হোয়াইট সিমেন্ট
এ ধরনের সিমেন্ট সিমেন্ট শুধু সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন ফ্লোরের মোজাইকের কাজ বা স্থাপনার বাহিরের দিকের fare face finishing এর জন্য এই সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়। এই সিমেন্টের মূল উপাদান ক্লিংকার কিন্তু এ ক্লিংকার সাধারন ক্লিংকার থেকে অনেক গুণ বেশি পরিশোধিত। ফলে এর দামও সাধারণ সিমেন্টের চেয়ে থেকে ৪ গুণ বেশি।
ষ্ট্যান্ডার্ড
ASTM (আমেরিকান সোসাইট ফর টেষ্টিং এন্ড মেটেরিয়ালস্) : C ১৫০-৯২
BS (বৃটিশ ষ্ট্যান্ডার্ড) : ১২:১৯৮৯
ব্যবহার
মোজাইকের কাজে ও বাহিরের দেয়ালের কাজে।
নিম্নলিখিতবিষয়গুলির জন্য সিমেন্ট চুন অপেক্ষা অধিক ব্যবহার উপযোগী এবং উৎকৃষ্ট
ভিজা এবং পানির নিচে নির্মাণ কাজ তৈরিতে।
যেখানে নির্মাণ কাজে স্থায়ীত্ব এবং অধিক শক্তির প্রয়োজন
যেখানে মর্টার বা প্লাষ্টার তাড়াতাড়ি জমান বাঁধার দরকার হয়।
পানিরোধক নির্মাণ কাজে।
সিমেন্ট পরীক্ষা
মিহিত্ব পরীক্ষা।
জমাট বাঁধার সময় পরীক্ষা (প্রাথমিক ও শেষ)।
সাউন্ডনেস্ পরীক্ষা।
রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পরীক্ষা।
কমপ্রেসিভ ও টেনসাইল ষ্ট্রেংন্থ পরীক্ষা।
সিমেন্ট মজুদ রাখার নিয়মাবলি
শুল্ক বায়ু চলাচল করে এমন জায়গায় সিমেন্ট রাখতে হবে।
দেয়ালের ঠেস দিয়ে রাখা যাবে না।
পানি সংস্পর্শে আসতে পারে এমন জায়গায় রাখা যাবে না।
ব্যাগগুলো ধাপে ধাপে রাখতে হবে।
একটি ব্যাগের উপর আরেকটি এভাবে সর্বোচ্চ দশটি ব্যাগ রাখা যাবে।
দুই লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গা থাকতে হবে।
ষ্টোর করার জায়গায় নিচে কাঠের গুড়া (ভুসি) ছিটিয়ে দিয়ে তার উপর কাঠের বাটাম রেখে সিমেন্ট রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে পানি সিমেন্টের সবচেয়ে বড় শত্রু। অতএব, সাবধান থাকতে হবে যাতে ঘরের দেয়াল বা মেঝে কিংবা সানশেড দিয়ে পানির ঝাপটা আসতে না পারে।
ঠেলা গাড়িতে সিমেন্ট সরবরাহের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে হঠাৎ বৃষ্টি এলেও সিমেন্ট ভিজে না যায়। এজন্য বর্ষাকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও ত্রিপল অথবা পলিথিন দিয়ে সিমেন্ট ঢেকে নিয়ে যেতে হবে।
সিমেন্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ ও তার উত্তর
১) গুটি ধরা
২) জমাট বাঁধতে দেরি হওয়া
৩) হাতপা ক্ষয়ে যাওয়া
৪) সিমেন্টের রং
৫) ওজন কম হওয়া
৬) ব্যাগ ফেটে যাওয়া
৭) মজুদ সংক্রান্ত সমস্যা
নিচে সমস্যাগুলোর ব্যাখ্যা করা হল
প্রথমেই গুটি ধরা সংক্রান্ত সমস্যা সম্বন্ধে কথা বলা যাক। মূলত সিমেন্টের ব্যাগ এয়ার টাইট বা বাতাস অপরিবাহী নয় এবং সিমেন্ট বাতাস থেকেও জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে। অতএব যদি সঠিকভাবে সিমেন্ট মজুদ করা না যায় তবে তাতে গুটি ধরতে পারে। সাধারণত দুই ধরনের দানা দেখা যায়। এক ধরনের গুটিকে হাতের আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে ভেঙ্গে যায়। সে ধরনের গুটি তৈরি হয় মূলত চাপের কারণে। এক ব্যাগ সিমেন্টের উপর যদি অনেকগুলো ব্যাগ রাখা হয় তবে কিছুদিন পর নিচের দিকের ব্যাগগুলোতে এই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে তা সিমেন্টে গুণগত মানের কোন পরিবর্তন করে না।
দ্বিতীয় ধরনের গুটি হাতের চাপে তো ভাঙ্গে না, হাতুড়ি দিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা করা হলেও সহজে ভাঙ্গে না। এই ধরনের গুটি তৈরি হয় সিমেন্ট পানির সংস্পর্শে এল। যতই বলা হোক যে সিমেন্ট কোনভাবেই পানি যায়নি তবুও এটা ১০০% নিশ্চিত যে পানি ছাড়া অন্য কোনভাবে এই ধরনের গুটি তৈরি হতে পারেনা। যদি ১ ব্যাগ সিমেন্টের ২০% এর বেশি দানাদার না হয়ে, তবে বাকি ৮০% সিমেন্ট স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। তবে এর চেয়ে বেশি দানাদার মিক্সিং অনুপাত বাড়িয়ে ঢালাই করতে হবে। সাধারণত পেপার ব্যাগের মুখের দিকে পাথর পাওয়া যায় আর পলি ব্যাগে পাওয়া যায় ভিতরের দিকে।
জমাট বাঁধতে দেরি করা
বিভিন্ন কারণে সিমেন্ট জমাট বাঁধতে দেরি করা। যেমন-
মিক্সিং এর সময় পানি বেশি দেওয়া
শীতল আবহাওয়া
বৃষ্টি হওয়া।
সিমেন্টের পরিমাণ কম হওয়া
বালির গুণগত মান ভাল না হওয়া
আগেই কিউরিং শুরু করা
অকারণে অথবা অতিরিক্ত অ্যাডমিক্সার ব্যবহার করা।
প্লাষ্টার করার আগে ঠিকমত দেয়াল ভিজিয়ে না নেয়া (গ্রাওটিং) না করা।
সিলিং প্লাষ্টার করার পূর্বে চিপিং না করা।
সাধারণত সিমেন্ট জমাট বাঁধতে এক থেকে দুইদিন সময় নেয়। তবে সঠিক শক্তি অর্জন করে সাত (৭) দিন পর। অতএব, জমাট বাঁধতে দেরি হলেই ভয় পাওয়া উচিৎ নয়।
হাত পা ক্ষয় হওয়া
সিমেন্টে চুনের উপস্থিতির কারণে হাতপা ক্ষয় হয়।
রং
সিমেন্ট সাধারণত ধূসর বর্ণের হয়। মূলতঃ যে সিমেন্ট যত সাদা সে সিমেন্ট তত ভাল। সিমেন্ট কালো হওয়া মানে এর মধ্যে আয়রনের পরিমাণ বেশি আছে। অথচ অতিরিক্ত আয়রন ঢালাইয়ের ক্ষতি করে। অতএব, সিমেন্ট রঙের ক্ষেত্রে উজ্জ্বলতার দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে।
লাসা না হওয়া
অনেক সময় রাজমিস্ত্রিরা অভিযোগ করেন যে সিমেন্ট লাসা টিকমত হচ্ছে না। তারা বুঝাতে চান যে সিমেন্ট এবং বালি মিশানোর পর পানি দেওয়া হলে ঠিকমত ফেনা হয় না সে কারণে তারা সিমেন্টের গুণগত মান সম্বন্ধে সন্দেহপোষণ করেন, কিন্তু কথাটি আদৌ সত্যি নয়। কারণ সিমেন্টে অতিরিক্ত চুন অথবা ভেজাল থাকলে তা পানির উপরে ভেসে উঠে ফেনা তৈরি করে, যা সত্যিকার অর্থে মসলা বা প্লাষ্টারের জন্য ক্ষতিকর।
খোয়া
ছোট ছোট পাথরের টুকরো অথবা ঝামা ইটের টুকরো কংক্রিটে আয়তন ও শক্তি দেয়। বাড়ী তৈরী করার সময় এর আকার সাধারণত: দু-রকমের হয়। পোনে এক ইঞ্চি অথবা এক সাথে দুটোকে মিশিয়ে দেয়া হয়। সাধারণত: ৬০:৪০ থেকে ৭০:৩০ এর অনুপাতে। এগুলোকে বলা হয় কোর্স এগ্রিগেট।
কোর্স এগ্রিগেট বাছাই:
এগুলো ঘনাকার এবং ধুলা মাটি ছাড়া হওয়া উচিত।
এগুলো বিভিন্ন আকারের হওয়া উচিত। ছোট বড় এগ্রিগেটের সঠিক মিশ্রণ থাকা উচিত।
বড় আকারে এগ্রিগেডের মাঝের খালি জায়গায় ছোট ছোট এগ্রিগেট, ছোট ছোট এগ্রিডেটের খালি জায়গা বালু দিয়ে ভরতে হয়, এতে কংক্রিট ঘন ও মজবুত হয়।
একই আকারের এগ্রিগেড ব্যবহার করা ঠিক নয় কারণ সমান আকারের জোড়-গুলোতে খালি জায়গা অনেক বেশী থাকে তাই এতে মোট ওজন কম হয়ে যায়।
ঢালাইয়ের পূর্বে এগ্রিগেট ভিজিয়ে নেয় উচিত।
খোয়া নির্মাণ কাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা কংক্রিট তৈরির কাজে ব্যবহ্রত হয়। তবে প্রথম শ্রেণীর ইট ভেঙ্গেই খোয়া তৈরি করা উচিৎ। খোয়ার আকৃতি বা সাইজ সাধারণত ৩/৪ ইঞ্চির বেশি এবং ১/৪ ইঞ্চির কম হওয়া উচিৎ নয়।
খোয়া তৈরির পXতির উপর নির্ভর করে খোয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়-
হাতে ভাঙ্গা
মেশিনে ভাঙ্গা
হাতে ভাঙ্গা
এ ধরনের খোয়া খুব ভাল আকৃতির হয়ে থাকে এবং এতে সুরকির পরিমাণ কম থাকে অবশ্য এই পXতিতে খোয়া তৈরিতে অধিক সময় লাগে।
মেশিনে ভাঙ্গা
এ ধরনের খোয়া বড়, ছোট হয়ে থাকে এবং সুরকির পরিমাণও বেশি হয়ে থাকে, তবে এ পXতিতে তাড়াতাড়ি খোয়া তৈরি করা যায়।
খোয়া ব্যবহারের পূর্বে সতর্কতা
ইট ভেঙ্গে খোয়া করার পর খোয়া ভালভাবে চালতে হবে যেন সুরকি না থকে এবং মিক্সার বানানোর আগে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময় ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে খোয়ার মধ্যকার ক্ষতিকর উপাদানসমূহ দূর হয়ে যায়।
ভেজানোর প্রয়োজনীয়তা
খোয়া ভেজানো না হলে তা কিছু পানি শোষণ করে যা সিমেন্ট পানির অনুপাত (ড/ঈ) নষ্ট করে।
খোয়া ভেজানো না হলে মিক্সার ভালো হয় না।
ইটের মধ্যে ক্ষতিকর পদার্থ যেমন অপরফ, অষশধষর, লবণ থাকলে তা বের হয়ে যায়।
রড
ডি-ফরমড্ বার বা, রড (লোহা)
সাধারণত একটি বাড়ি নির্মাণের মোট খরচের ১০ থেকে ১২ ভাগ খরচ হয় রড কেনার কাজে। একটা ছাদের ক্ষেত্রে কংক্রিট দেয় চাপ সহ্য করার শক্তি আর রড দেয় টান সহ্য করার শক্তি। এজন্য বাড়ি নির্মাণের জন্য রড কেনার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। cast iron এবং wrought iron এর মধ্যবর্তী অবস্থাকে লোহা বলে। cast iron এ বেশি পরিমাণ কার্বন থাকে সেই তুলনায় wrought iron এ কার্বন কম থাকে। রট আয়রন প্রায় বিশুX লোহা।
কার্বনের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে লোহাকে তিন প্রকারে ভাগ করা যায়
মৃদু কার্বন লোহা
মাঝারি কার্বন লোহা
উচ্চ কার্বন লোহা
মৃদু কার্বন লোহা বা মাইল্ড লোহা
এ ধরনের লোহাতে কার্বনের পরিমাণ ০.২৫%।
মাঝারি কার্বন লোহা
এ ধরনের লোহাতে কার্বনের পরিমাণ ০.২৫% থেকে ০.৭% থাকে।
বেশি কার্বন লোহা
এ ধরনের লোহাতে কার্বনের পরিমাণ ০.৭% থেকে ১.৫% থাকে।
রডের মসৃণতার উপর নির্ভর করে দুভাগে ভাগ করা যায়
মসৃণ রড
অমসৃণ বা ডি-ফরমড্ রড
রড ব্যবহারের নির্দেশিকা
নির্মাণ কাজে রড ব্যবহারের পূর্বে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান, ইঞ্জিনিয়ার বা কনসালটেন্ট কর্তৃক রডের গুণাগুণ পরীক্ষা করা অত্যাবশ্যক।
৩ ও ৪ সুতা রড- সাধারণত বাড়ি বা ভবনের ছাদের রড হিসাবে ডিজাইনার কর্তৃক ব্যবহৃত হয়।
৫ সুতা বা ততোধিক রড- কলাম, ফাউন্ডেশন ও বিমে ব্যবহৃত হয়।
২ সুতা বা ৩ সুতা রড- ষ্টিরাপ বা টাই রড হিসেবে বিম বা কলামে ব্যবহৃত হয়।
আমাদের দেশে দুই ধরনের শক্তি সম্পন্ন রড ব্যবহার করা হয়। এগুলো হচ্ছে ৪০ গ্রেড ও ৬০ গ্রেডের রড। ৪০ গ্রেডের রডের টান সহ্য করার ক্ষমতা ৪০,০০০ ঢ়ংর (Pound per square inch) এবং ৬০ গ্রেডের রডের টান সহ্য করার ক্ষমতা ৬০,০০০ ঢ়ংর ৪০ গ্রেড রডের চেয়ে ৬০ গ্রেড রডের শক্তি বেশি। সাধারণ নির্মাণ কাজে ৪০ গ্রেড রড ব্যবহারই উত্তম, যেহেতু বাজারে ৬০ গ্রেড রড সহজলভ্য নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই ৪০ গ্রেডকেই ৬০ গ্রেড রড হিসেবে চালানো হয়, তাই ৪০ গ্রেড রড বেশি লাগলেও এটা ব্যবহার করা উচিৎ। কংক্রিট তৈরি করতে ইটের খোয়া ব্যবহার করা হল সেক্ষেত্রে ৬০ গ্রেডের রড ব্যবহার না করাই ভালো সাধারণত ৬০ গ্রেড রড ব্যবহার করতে হলে পাথরের খোয়া ব্যবহার করতে হবে।
লোহার রড এর আকার আকৃতি সমান হতে হবে। ফাঁটল বা চিড় থাকবেনা। প্লেইন রড অপেক্ষা ডিফরমড্ বারে বন্ড ভালো হয়। মরিচা আক্রান্ত রড মরিচা রড দূর না করে ককনও ব্যবহার করতে নেই। লোহা নির্ধারিত জায়গায় তার এবং কভার ব্লকের সাহায্যে লাগানো উচিত। লোহা লাগাবার সময় পর্যাপ্ত ডেভলপমেন্ট লেংথ দেওয়া উচিত (৪০ল্প লোহার ব্যাস অথবা ডায়মিটার), যেখানে দুটো লোহার ল্যাপিং এবং এ মেম্বারের রড অন্য মেম্বারে যায় (যেমন বীম ও কলামের সংযোগস্থ)।
রং/পেইন্ট ও থিনার
বাড়ি যত সুন্দর ভাবেই তৈরি করা হোক না কেন ভাল রং ছাড়া সে বাড়ি হয়ে পড়ে ম্লান। বাড়িকে আলোকিত করার উপায় হল রং/পেইন্ট। শুধু বাড়ির বাহ্যিক সৌন্দর্য নয় বরং এমন রং ব্যবহার করা উচিৎ যা বাড়িকে প্রকৃতির অত্যাচার থেকে রক্ষা করে। ভবনের বাইরে চুনকাম বা হোয়াট ওয়াশ, সিমেন্ট ওয়াশ, স্নোসেম/ডিউরেসেম ব্যবহার করা যায় এবং ভবনের ভিতরে ডিস্টম্পার, প্লাষ্টিক পেইন্ট ব্যবহার করা যায়। প্লাষ্টিক পেইন্টের দেয়াল পানিতে ধুয়ে পরিস্কার করা যায়। আমাদের দেশে ভালো মানের পেইন্ট পাওয়া যায় যা গ্রীল বা লোহা জাতীয় সারফেসে ব্যবহার করা যায়।
রং/পেইন্ট ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা
পেইন্ট ও ভার্ণিশ মরিচা থেকে লোহাকে রক্ষা করে।
কাঠকে পোকামাকড়, ছত্রাক এবং পচন থেকে রক্ষা করে।
বাড়ির দেয়ালকে প্রকৃতির অত্যাচার থেকে রক্ষা করে।
বাড়ির বাইরের রং/পেইন্ট বাড়ির ভিতরের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। বাড়ির বাইরের সৌন্দর্য করে উজ্জ্বল।
বিভিন্ন প্রকার পেইন্ট
অ্যালুমিনিয়ান পেইন্ট
সিমেন্ট পেইন্ট
কোলটার পেইন্ট
এনামেল পেইন্ট
ক্রমিক নং পেইন্ট ব্যবহারের স্থান পেইন্ট ধরন (টাইপ) মন্তব্য
ক প্লাষ্টারের ওয়াল (ভবনের বাইরের দেয়াল)চুনকাম
কালার ওয়াশ
সিমেন্ট ওয়াশ
প্লাষ্টিক পেইন্ট
¯েœাসেমডেউরোসেম
খ ভবনের ভিতরের দেয়াল হোয়াইট ওয়াশকালার ওয়াশ
ডিষ্টেম্পার
প্লাষ্টিক পেইন্ট
চক পুটিং হিসেবেব্যবহৃত হয়
গ স্যাঁতস্যাঁতে প্লাষ্টার দেয়াল ড্যাম্প স্টপ পেইন্ট
ঘ সিরামিক ইটের দেয়ালরিপেলেন্ট সিলিকন ওয়াটার
ঙ বাথরুম এবং কিচেনরুমের দেয়াল এনামেল পেইন্টরাবার পেইন্ট
চ ভবনের ছাদ রুফিং কমপাউন্ড
ছ ভবনের মেঝে (ফ্লোর)রেড-অক্সাইড রং ব্যবহার নেট সিমেন্টের সাথে
জ কাঠের দরজা-জানালা ফ্রেঞ্চপলিশএনামেল পেইন্ট
ঝ লোহার দরজা-জানালা এনামেল পেইন্ট
ঞ কংক্রিট জোড়া দেওয়া(শুল্ক অবস্থান)
এপক্সি জয়েন্টিংকম্পাউন্ড
রং বা পেইন্টিং আমাদের ঘরে সুরক্ষা ছাড়াও আরও অনেক কিছু প্রদান করে। ঘরের রং ব্যক্তিত্বের প্রতিবিম্ব। রং এর কাজ আমরা তিন ভাগে করব।
১. রং করার পূর্ব প্রস্তুতি।
২. সারফেস সমতল করার কাজ।
৩. রং ব্যবহার করা।
কিছু পরামর্শ যা আপনার রং করার কাজকে আরও সহজ কর।
যে ঘরটি রং করা হবে তার দেওয়ালে যদি ফাটল অথবা সিপেজ থাক তাহলে আগে ওটাকে মেরামত করিয়ে নিন।
কি ধরনের রং এবং শেড চাই সেটা আগে নির্বাচন করে নিন। গুণগত মানসম্পন্ন কোম্পানীর সাহায্য নিন।
রং কোম্পানির সমস্ত উৎপাদিত পণ্যের খবর নিন তাতে করে জানতে পারবেন আপনার প্রয়োজন।
বাইরের রং হালকা রাখুন তাতে ভিতরে তাপমাত্রা কম থাকবে।
ভিতরে দেওয়াল যেখানে প্রাকৃতিক আলো চাই সেখানে হালকা রং লাগান।
রং লাগাবার কাজ (ঘরের ভিতরে দেওয়ালের জন্য):
দেওয়াল শিরিষ কাগজ দিয়ে পরিস্কার করে নিন।
ডবল প্রাইমার ১ অথবা ২ কোট লাগান।
দেওয়ালের উপর পুটিং ১ অথবা ২ কোর্ট লাগান। (যদি ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হয়)
প্রাইমার দিয়ে আরেকবার ১ অথবা ২ কোর্ট লাগান।
শেষে ২ বা ৩ কোট রং লশাগান।
সিন্থেটিক এ্যানামেল বা তেল রংয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন মত থিনার ব্যবহার করুন।
থিনার
পেইন্টের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
বিভিন্ন প্রকার থিনার হচ্ছে
তারপিন তেল
ন্যাফতা
স্পিরিট
পানি
মোজাইক
মোজাইক হলো একধরনের বহুলব্যবহৃত ফ্লোর ফিনিশ। কংক্রিটের ফ্লোরের উপর মার্বেল পাথরকুচি (৬মি. মি. এর ছোট) সিমেন্ট , সাদা পাউডার, পানি নিরোধক এজেন্ট ইত্যাদি আনুপাতিক হারে মিশিয়ে যে ফ্লোর ফিনিশ তৈরি করা হয় তাকে মোজাইক বলে।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
ক) পাথর কুচি = ২ভাগ
খ) সিমেন্ট (গ্রে ও হোয়াইট) = ১ ভাগ
গ) পানি = প্রয়োজন মত
ঘ) ঘর্ষণ পাথর = প্রয়োজন মত
মার্বেল চিপস সাধারণত ভারতীয় বা পাকিস্তানি হয়ে থাকে। আমাদের দেশে জয়পুরহাটে উন্নতমানের মার্বেল পাথর থাকলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে উত্তোলন ও ব্যবহার শুরু হয়নি।
তৈরির পদ্ধতি
কংক্রিটের ফ্লোরের উপর নির্দিষ্ট সাইজের মার্বেল পাথরকুচি, রঙিন/সাদা সিমেন্ট, সাদা পাউডার, পানি নিরোধক এজেন্ট ইত্যাদি মিশিয়ে পানি দিয়ে মসলা তৈরি করা হয়। মোজাইকের কাজ শুরু করার পূর্বে ১:২ (১ ভাগ সিমেন্ট, ২ ভাগ বালি) অনুপাতে নিচের মূল ফ্লোরটি তৈরি করে নেয়া হয়। এর উপর মোজাইকের মসলা আন্ত ১/২” পুরু করে প্রলেপ দেয়া হয়। মোজাইকের এ প্ররেপটি ১৫ থেকে ২০ দিন যথানিয়মে কিউরিং করানো হয়। অতঃপর পর্যায়ক্রমে ৪০,৬০,৮০,১০০ ও ১২০ নং পাথর দিয়ে ঘর্ষণ করে মসৃণ করা হয়। এ কাজকে মোজাইক কাটিং ওয়ার্ক বলে।
মোজাইক অনেকটা টাইলসের মত কাজ করে। তবে মোজাইকে টাইলসের চেয়ে খরচ কম। মোজাইকে বিভিন্ন ডিজাইন করা সম্ভব।
এখানে বিভিন্ন প্রকার মোজাইকের পাথর এবং সিমেন্টের মূল্য দেওয়া হল
প্রকার উৎস ওজন (ব্যাগ প্রতি) মূল্য
সাদা পাথর ইন্ডিয়ান ৪৫ কেজি ২৩০-৩০০
কালো ইন্ডিয়ান ৪০ কেজি ৯০-১১০
রঙিন ইন্ডিয়ান ৪০ কেজি ২৪০-২৬০
সাদা পাথর পাকিস্তানী ৪০ কেজি ৪৫০-৫০০
সাদা সিমেন্ট থাইল্যান্ড ৪০ কেজি ৬০০-৬৫০
সাদা সিমেন্ট বাংলাদেশ ৪০ কেজি ৪২০-৬০০
প্রয়েদ মূল্য তালিকা পরিবর্তীত বাজার দরের উপর নির্ভরশীল।
কাঠ
প্রাচীনকাল হতে মানুষ বসতবাড়ির খুঁটি, কড়ি, বরগা, চৌকাঠ, দরজা, জানালা, দেয়াল, মেঝে, আসবাবপত্র ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি করে আসছে। গাছ থেকে আমরা কাঠ পেয়ে থাকি। বর্তমানে রড, সিমেন্ট, পাথর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ সামগ্রীর পাশাপাশি কাঠও ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশে সাধারণত যে সমস্ত কাঠ ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে কাঠাল, চিটাংগা সেগুন, চিটাংগা শীলকড়ই, মেহগনি, শাল, গর্জন উন্নতমানের।
কাঠের সুবিধাসমূহ
সহজে সব জায়গায় পাওয়া যায়।
পুনঃবিক্রয়মূল্য অধিক।
বড় আকার থেকে ছোট আকারে পরিণত করে সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যায়।
কাজ করা খুব সহজ এবং কাঠের কাজ নষ্ট হলে সহজে কাঠ লাগিয়ে বা বদলে ঠিক করা যায়।
সহজে জোড়া লাগানো যায়।
অনেক হালকা, তাই ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় নির্মাণকাজে ব্যবহার উপযোগী।
ঘরের সুন্দর আসবাবপত্র তৈরির জন্য খুব ভাল উপাদান।
ভাল শব্দ নিয়ন্ত্রক।
এর সাথে লোহার প্লেট লাগিয়ে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বিভিন্ন প্রকার কাঠের ব্যবহার
ঘরের আসবাবপত্র বা সুন্দর সুন্দর ফার্নিচার তৈরিতে মূলত মেহগনি, কড়াই, চম্বল, কাঁঠাল, সেগুন ইত্যাদি কাঠ ব্যবহৃত হয়।
ঘরের দরজার চৌকাঠ তৈরিতে মূলতঃ মেহগনি, শিলকড়ই, কড়ই, জাম, গজারি কাঠ ব্যবহৃত হয়।
দরজার পাল্লার কাজে শাল, সেগুন, গামারি কাঠ ব্যবহৃত হয়।
নির্মাণ কাজের সাটারিং তৈরিতে মূলতঃ কম দামী কাঠ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ভাল কাঠ শনাক্তকরণ পদ্ধতি
কাঠের রং, আঁশ, গন্ধ, ফাটল ও ওজন ইত্যাদি বাহ্যিকভাবে ভালভাবে দেখে ভাল কাঠ শনাক্ত করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে কাঠের রঙের ব্যাপারে জানতে হবে। যেমন- শিলকড়ই অনেকটা খয়েরি রঙের হয়ে থাকে, কাঁঠাল কাঠ হলদে রঙের হয়ে থাকে, মেহগনি, গজারি হাল্কা কালচে ও হলদে রঙের হয়ে থাকে।
কাঠ ব্যবহারে সতর্কীকরণ নির্দেশিকা ও সংরক্ষণ করার উপায়
কাঠের কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা যায়, কাঠ ব্যবহারের সময় সে সব সমস্যা আছে কি না দেখে ব্যবহার করতে হবে। সমস্যাগুলো নি¤œরূপঃ
১. গিঠ (Knots)
২. ব্যাবর্ত আঁশ (Twisted Fibers)
৩. ফাট (shakes)
৪. আপসেট (updates)
৫. ত্বকস্ফোটক বা আব (Ring galls, also known as burls or excrescence)
৬. পাটল (Foxiness)
৭. Compression wood
৮. Pitch pockets
কাঠের স্থায়ীত্ব বাড়ানোর জন্য কাঠে সাধারণত পেইন্ট, বিটুমিন, প্রলেপ, ভার্ণিশ, ক্রিয়োজট, তেল ইত্যাদি যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়।
Share this:
Tuesday, March 26, 2013
দাবি আদায়ের সহজ উপায় ...
শফিক রেহমান
স্থান: ধানমন্ডিতে বিশিষ্ট ব্যারিস্টার ড. এম আহসানের চেম্বার। চারদিকের দেয়ালে বুকশেলফে চামড়ার বাধানো সব ল রিপোর্ট। ডেস্কে ফাইলের ছোট ছোট পাহাড়। ঘরের এক কোনায় একটা টেবিলে টেলিভিশন।
কাল: মার্চ ২০১৩-র প্রথম সপ্তাহ। সন্ধ্যাবেলা।
পাত্র: ব্যারিস্টার এম আহসান ও তার পাড়ার ভাইভাই স্টোর্সের মালিক কবির মিয়া। উভয়েই মধ্যবয়সী।
সতর্কীকরণ: সকল ঘটনা, চরিত্র ও সংলাপ সম্পূর্ণ কাল্পনিক।
কবির মিয়া: (দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে) খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি স্যার। অনেক উকিল-ব্যারিস্টারের কাছে গিয়েছি স্যার। সবাই বললেন, আপনি মুশকিল আহসান ব্যারিস্টার নামে বিখ্যাত। আপনিই স্যার পারবেন আমার মুশকিল আহসান করতে।
ব্যারিস্টার এম আহসান (শান্ত মুখে): আমি চেষ্টা করবো। কিন্তু সফল হবো কি না হবো, সেটা মহান আল্লাহতালার হাতে। বলুন, আপনার বিপদটা কি?
কবির: আমার উচ্চতা চার ফিট সাড়ে এগার ইঞ্চি। অর্থাৎ, পাচ ফিটের মাত্র আধা ইঞ্চি কম।
ব্যারিস্টার: তাতে কি? আপনি তো জীবনে নিজেকে ভালোই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আপনার দোকান থেকে আমার বিবিসাহেব চাল-ডাল, তেল-নুন, পেয়াজ-রশুন, চা-দুধ-সাবান-শ্যাম্পু, মোম-ব্যাটারি সবই কেনেন। আপনার দোকান তো ভালোই চলে। আপনি চার ফিট সাড়ে এগার ইঞ্চি হওয়ায় ব্যবসায়ে তো তার কোনো মন্দ প্রভাব পড়েনি। সমস্যা কোথায়?
কবির: সমস্যা স্যার আমার উচ্চতা পাচ ফিট নয়, পাচ ফিটের আধা ইঞ্চি কম। আর এটা স্যার কোনো ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, এটা স্যার এখন আমার জীবন-মরণ সমস্যা।
ব্যারিস্টার (কৌতূহলী স্বরে): তার মানে?
কবির (নিচু স্বরে): কিছুক্ষণ আগে সংসদে আওয়ামী লীগ সরকার উচ্চতা অপরাধী আইন পাস করেছে।
ব্যারিস্টার (বিস্মিত মুখে): উচ্চতা অপরাধী আইন? (তিনি টিভির রিমোট কনট্রোলে টিপলেন।)
কবির: হ্যা। স্যার। এই আইনে বিধান করা হয়েছে বাংলাদেশে বসবাসকারী যেসব বাংলাদেশী পুরুষ নাগরিকের দৈহিক উচ্চতা পাচ ফিটের কম তাদের অপরাধী রূপে গণ্য করা হবে এবং তাদের প্রত্যেকের প্রাণদণ্ড হবে। এই প্রাণদণ্ড অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (হঠাৎ হাউমাউ করে কেদে উঠে) স্যার আমার উচ্চতা পাচ ফিটের কম। আমি বাংলাদেশী পুরুষ। আমাকে ফাসির দড়ি থেকে বাচান স্যার। আমাকে বাচান স্যার।
ব্যারিস্টার (টিভিতে স্ক্রল নিউজ দেখতে দেখতে): অ্যাবসার্ড। অ্যাবসার্ড। অ্যাবসার্ড। (একটু চুপ থেকে) কিন্তু তারা এটা করতেই পারে। সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মেজরিটি আছে।
কবির: মেজরিটি থাকলেই কি তারা আইন করে সূর্যকে চাদ অথবা চাদকে সূর্য বলতে পারবে? সবাইকে ডান হাত নয়Ñ বাম হাতে খেতে নির্দেশ দিতে পারবে? পুরুষদের শাড়ি-ব্লাউজ আর মেয়েদের শার্ট-প্যান্ট পরতে বলবে?
ব্যারিস্টার: আওয়ামী লীগ মনে করে তারা পারবে। ক্ষমতায় এসে তারা তো সময়ও বদলে দিয়েছিল।
কবির (উত্তেজিত হয়ে): সংসদে মেজরিটি থাকলেই কি এমন আইন পাস করার অধিকার তাদের আছে? আমাদের মৌলিক অধিকার বিষয়ে সংবিধানে যা লেখা আছে, এই আইনটি কি তার বিরোধী নয়?
ব্যারিস্টার (বুকশেলফ থেকে বাংলাদেশের সংবিধান বের করে পড়া শুরু করলেন): সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী ...
কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (বই থেকে চোখ তুলে) দেখুন, এখানে উচ্চতা বিষয়ে কিছু লেখা নেই। সেই সুযোগটা আওয়ামী লীগ নিয়েছে। তবে নারী-পুরুষে ভেদাভেদ করা হয়েছে, এই আইনে পুরুষদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত নারী ভোটারদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের এই আইনের আওতা থেকে বাদ দিয়েছেন। সে যাই হোক, আইন পাস হয়ে গিয়েছে। এখন আপনাকে কিভাবে বাচানো যায় সেই পথ বের করতে হবে। আপনি কি আপনার উচ্চতার মাপ বিষয়ে একশ ভাগ নিশ্চিত?
কবির: হ্যা। আমি নিজে কয়েকবার মেপেছি। বউকে দিয়েও মাপিয়েছি। বাইরে কাউকে বলিনি। তারা হয়তো আমাকে পাচ ফিট উচ্চতারই ভাবে। কিন্তু একবার যদি গোপালী পুলিশের কাছে কেউ রিপোর্ট করে দেয়, তাহলেই আমার জীবন শেষ।
ব্যারিস্টার: এ বিষয়ে আর কারো উপদেশ নিয়েছেন কি?
কবির: প্রথমে আমি আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, রিং ধরে ঝুলে ব্যায়াম করলে এবং নিয়মিত বাইসাইকেল চালালে হয়তো আধা ইঞ্চি লম্বা আমি হতে পারবো। কিন্তু এতে সময় লাগবে। তারপর আমি গিয়েছিলাম একটি বইয়ের দোকানে। লম্বা হউন এই টাইটেলে বইয়ের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, কোনো ওষুধ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিতে বাড়িতে থেকেই তিন ইঞ্চি থেকে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হওয়া যায়। কিন্তু এই পদ্ধতিতেও সময় সমস্যা আছে। লম্বা হতে সময় লাগবে। তাছাড়া, তাদের এই দাবির প্রতি আমি ভরসা করতে পারি না।
ব্যারিস্টার: আপনি এলিফ্যান্ট রোডে কোনো জুতার দোকানে গিয়ে সবচেয়ে উচু হিলের জুতা ট্রাই করতে পারেন।
কবির: সেটা ভেবেছিলাম। কিন্তু যে কোনো সময়ে ধরা পড়ে যেতে পারি। বিশেষত নামাজ পড়ার সময়ে। তখন তো জুতা খুলে নামাজ পড়তে হবে। আওয়ামী সরকার তো সব মসজিদের কনট্রোল নিয়ে ফেলেছে। সব মসজিদ গোয়েন্দা নজরে রাখছে।
ব্যারিস্টার: বিদেশে পালিয়ে যাবার কথা ভেবেছেন?
কবির: হ্যা। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। সব বর্ডারে বিএসএফ খুব কড়া পাহারা দিচ্ছে। স্যার একটা কথা বলতে পারেন? কেন এই আইনটা করা হলো?
ব্যারিস্টার: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এক দিকে শেখ মুজিবের বিশাল ইমেজ প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক কর্মসূচি নিয়েছে। অন্যদিকে জিয়ার ইমেজ ধ্বংস করার সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা দেখাতে চাইছে শেখ মুজিব ছিলেন উচ্চতায় বেশি। জিয়া কম। অর্থাৎ, জিয়া ছিলেন ছোট মাপের মানুষ। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে সব ছোট মাপের মানুষকে চিরবিদায় দিতে হবে। আমার ধারণা, এটাই এই আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য। তবে এই আইনপ্রণেতারা জানেন না, জিয়ার উচ্চতা প্রায় সাড়ে পাচ ফিট ছিল। তাছাড়া তারা এটাও জানেন না যে বিশ্বের বহু সফল রাষ্ট্রনায়কের উচ্চতা ছিল কম। যেমন ইসরেলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন-এর উচ্চতা ছিল পাচ ফিট। ইনডিয়ার মোহনদাস করমচাদ গান্ধী এবং রাশিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ -এর উচ্চতা ছিল পাচ ফিট তিন ইঞ্চি।
কবির (উচু স্বরে): দেখুন, দেখুন, টিভিতে কি দেখাচ্ছে।
টিভিতে ভিজুয়াল ও স্ক্রল: সোনারগাও হোটেলের সামনের গোল চত্বরে দ্বিতীয় গণজাগরণ মঞ্চ স্থায়ীভাবে বানানো রয়েছে। সমবেত ব্লগারদের স্লোগান উঠছে। একটা একটা বেটে ধর, সব বেটেকে জবাই কর। বেটেদের বিদায় চাই, বেটেদের ফাসি চাই। ফাসি চাই। ফাসি চাই।
টিভির ভিজুয়ালে একজন ব্লগার পিতার কোলে একটি বছর পাচেকের শিশু মেয়ের ইন্টারভিউ নিল টিভি রিপোর্টার।
রিপোর্টার: তুমি সব বেটেদের ফাসি চাও?
শিশু: হ্যা চাই।
রিপোর্টার: কেন ফাসি চাও?
শিশু: আব্বু বলেছে, বেটেরা পচা।
রিপোর্টার: ঠিক। ঠিক। (শিশুর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে দর্শকদের দিকে) এখন দ্বিতীয় গণজাগরণ মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন জনপ্রিয় ব্লগার চাদরবাবা কামরান হোসেন পোদ্দার। তিনি তার বক্তব্য রাখছেন।
কামরান (চিৎকার করে কাপা কাপা গলায় নাটকীয় ভঙ্গিতে): ত্রিশ লক্ষ শহীদের বুকের তাজা রক্ত আর দুই লক্ষ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলার মাটি আজ বেটেদের দ্বারা কলংকিত। এই কলংক আমাদের মুছে ফেলতেই হবে। সব বেটেদের ফাসি দিতে হবে।
ব্লগার জনতা (সমস্বরে): ফাসি চাই। ফাসি চাই।
কামরান: সব বেটেদের জবাই করতে হবে।
ব্লগার জনতা: জবাই করো। জবাই করো।
কামরান: আমি এই গোল চত্বরের নাম দিলাম লম্বা স্কোয়ার। আপনারা সবাই এটা সমর্থন করেন? হাত তুলে জানান।
ব্লগার জনতা (হাত তুলে): লম্বা স্কোয়ার। লম্বা স্কোয়ার।
এই সময়ে কিছু খাটো পুরুষ ব্লগারকে ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়তে দেখা গেল। টিভি ক্যামেরা অন্যদিকে ফোকাস করলো।
কামরান (সিরাজউদদৌলা স্টাইলে): আমি নির্দেশ দিচ্ছি ত্রিশ লক্ষ শহীদের বুকের তাজা রক্ত আর দুই লক্ষ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলার মাটির কলংক মোচনের দৃঢ় প্রত্যয়ে আপনারা সবাই এখন থেকে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা এখানেই থাকবেন। বাংলার মাটি সকল বেটেমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আপনারা এখানেই থাকবেন। আপনাদের জন্য বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ থেকে ফুল প্লেট বিরিয়ানি এবং মিনারাল ওয়াটারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরো অনেক টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা বসছে। এই সার্ক ফোয়ারার নিচে মেশিনের যে বেইসমেন্ট আছে সেখানে পোর্টেবল টয়লেট বসানো হয়েছে। আপনারা এই স্থান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবেন। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেন না ওঠে আমরা গাজা খাই, সিগারেটের শেষাংশ বাট আর ব্যবহৃত কনডম ফেলে যাই। জয় লম্বা বাংলা।
ব্লগার জনতা (সমস্বরে): জয় লম্বা বাংলা।
ব্যারিস্টার (এক হাতে কপাল চেপে ধরে): দেশ আজ এমন এক ব্যক্তির খপ্পরে যার চ্যালা চামুণ্ডারা দেশকে আজ লম্বা আর বেটেদের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে। দেশকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। জানি না এই যুদ্ধের পরিণতি কি হবে। তবে নিজের প্রাণ বাচানোর জন্য আপনি একটা চেষ্টা করতে পারেন। (একটা কাগজে রূপসী বাংলা হোটেলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের নাম লিখলেন)। এই অফিসারটির সঙ্গে দেখা করুন।
কবির: তারপর?
ব্যারিস্টার: উত্তরটা পরে দিচ্ছি। আপনার স্ত্রীর নাম কি?
কবির: আকলিমা।
ব্যারিস্টার: ওই নামে চলবে না। ওর নাম পালটে ফেলতে হবে। আমি এখনই একটা ডিড পোল করে দিচ্ছি। আপনার স্ত্রীর নতুন স্টাইলিশ নাম হবে ইয়াসমিন কবির। আপনারা দুজনা একটা লিমিটেড কম্পানি করবেন যার নাম হবে টলমার্ক (Tallmark) কম্পানি লিমিটেড। এটাই হবে বাংলাদেশের প্রথম উচ্চতাভিত্তিক কম্পানির নাম। পরে ডেসটিনির মতো কোনো আওয়ামী সমর্থক সাবেক সেক্টর কমান্ডারকে কম্পানির চেয়ারম্যান করবেন। প্রধানমন্ত্রী খুশি হবেন এবং তার বর্তমান নির্দেশক চাদরবাবাও খুশি হবেন।
কবির (রুদ্ধশ্বাসে): তারপর?
ব্যারিস্টার: টলমার্ক কম্পানির তরফ থেকে আপনারা দুজন দশ হাজার কোটি টাকা লোন নেবেন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ওই শাখা থেকে। বাংলাদেশকে কলংকমুক্ত করার একটি ধাপ হিসেবে এই লোন মঞ্জুর করবে ওই ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়। টাকাটা পেয়েই আপনি সাত হাজার কোটি দান করবেন আওয়ামী লীগের ইলেকশন ফান্ডে। দুই হাজার কোটি দান করবেন চাদরবাবার ফান্ডে বিরিয়ানি ও মিনারাল ওয়াটার সাপ্লাই যেন অব্যাহত থাকে সেই লক্ষ্যে। আর এক হাজার কোটি রাখবেন নিজের জন্য।
কবির (কিছুটা সন্দেহের স্বরে): কিন্তু। কিন্তু আমার উচ্চতা তো পাচ ফিটের আধা ইঞ্চি কম থেকেই যাবে। তাহলে আমি বাচবো কি করে?
ব্যারিস্টার (স্মিত মুখে কনফিডেন্ট স্বরে): আপনি বাচবেন এবং আরো লোন পাবেন। ভেবে দেখুন আপনার চাইতে অনেক বেশি টাকা শেয়ারবাজার থেকে লুট করেছে দরবেশ। তার কি কিছু হয়েছে? আওয়ামী আমলে বহু অর্থনৈতিক ঘাপলা হয়েছে। কারো কি কিছু হয়েছে? হয়নি।
কবির: হলমার্কের তানভীর আর তার স্ত্রী জেসমিন তো জেলে গিয়েছেন।
ব্যারিস্টার: তারা একটা ভুল করেছিলেন। তারা মাত্র চার হাজার কোটি টাকা মেরেছেন। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এটা তেমন কোনো বড় এমাউন্ট নয়। তারা আওয়ামী ফান্ডে বেশি টাকা দিতে পারেননি। আপনি শুরু করুন দশ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। তারপর এগোতে থাকেন। ইতিমধ্যে একটি আওয়ামী কোট বানিয়ে ফেলুন এবং সর্বক্ষণ সেটা গায়ে ও চার ইঞ্চি উচ্চতার একটা শাদা কিস্তি টুপি মাথায় পরে থাকুন। আপনার দৃশ্যমান উচ্চতা হবে পাচ ফিট সাড়ে তিন ইঞ্চি।
কবির: আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ। ব্যারিস্টার সাহেব, আপনি আমাকে বাচিয়ে দিলেন। আপনাকে কতো ফিস দেব?
ব্যারিস্টার (মৃদু হেসে): আগে লোনের টাকাটা আপনার একাউন্টে আসুক। তারপর বলবো আমার ফিস কতো।
৪ মার্চ ২০১৩
শফিক রেহমান: প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বিশিষ্ট টিভি অ্যাংকর।
facebook.com/ShafikRehmanPresents
তৃতীয় কারো রাষ্ট্রপতি হবার সম্ভাবনা কতটুকু?
আমীন আল রশীদ
মো. জিল্লুর রহমানের পরে দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- এ নিয়ে সব মহলেই আলোচনা এবং জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে সেই আলোচনা এখন পর্যন্ত দুজন ব্যক্তিকে ঘিরে। একজন জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, যিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং অন্যজন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এর বাইরে তৃতীয় আর কারোর সম্ভাবনা কতটুকু?
যে দুজনকে নিয়ে আলোচনা চলছে, জনমত নিলে তাদের মধ্যে আবদুল হামিদের পক্ষেই বেশি মানুষ বলবেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, যিনি এখনও রাষ্টপ্রতি হবার স্বপ্ন দেখেন, তিনিও গণমাধ্যমে বলেছেন, আবদুল হামিদ যদি রাষ্ট্রপতি হন, সেটিই মঙ্গলজনক হবে। তবে শোনা যাচ্ছে সাজেদা চৌধুরীর পক্ষেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মতামত প্রবল।
তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। আর তা হলো জিল্লুর রহমানের পরে যিনিই রাষ্টপ্রতি নির্বাচিত হন না কেন, সংবিধান অনুযায়ী তিনি পরবর্তী পাঁচ বছর স্বীয় পদে থাকবেন, যদি না তিনি স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদ যদি তাকে ইমপিচ বা অভিশংসন না করে। সেক্ষেত্রেও জটিলতা আছে। রাষ্টপ্রতিকে ইমপিচ করতে চাইলে সংসদের দুই তৃতীয়াংশের ভোট লাগবে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, প্রধান দুই দলের নেত্রীদ্বয় যদি একত্রে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন, সেটি সবচেয়ে মঙ্গল। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হকও বঙ্গভবনে গণমাধ্যমকে এ কথা বলেছেন। যদিও সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বিশেষজ্ঞরা মূলত যে কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বড় দুই দলের ঐকমত্য চাচ্ছেন, সেটি হলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবার কথা। সেই নির্বাচন কোন ধরণের সরকারের অধীনে হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। বিরোধী দল স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রথমে যদিও বলেছিল যে, উন্নত দেশে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট তার পদে থাকা অবস্থায়ই নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেরকম হবে। কিন্তু পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন যে, নির্বাচনের আগে তিনি রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দিতে বলবেন এবং নির্বাচন কমিশনকে তফসিল ঘোষণা করার পরামর্শ দেবেন।
তার মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি যিনিই হোন না কেন আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তাকে বেশ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি বড় দুই দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তি হন এবং নির্বাচনের আগে যদি তার নেতৃত্বে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যায়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে কারণেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে এবার রাষ্ট্রপতি করা যায়।
প্রশ্ন হলো সেরকম ব্যক্তির সংখ্যা কত? সর্বজন শ্রদ্ধেয়, বিতর্কের ঊর্ধ্বে এবং রাষ্ট্রপতি হবার যোগ্যতা আছে, এরকম ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করতে গেলে সেই তালিকা খুব দীর্ঘ হবে না। তবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। যতটা আন্দাজ করা যায় তার ব্যাপারে কেউ আপত্তি তুলবে না। ব্যারিস্টার রফিকুল হকের নামও বলা যায়। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন। কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতিও এই তালিকায় আসতে পারেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
একবার শোনা গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিকও রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। কিন্তু বিএনপি তাকে মানবে বলে মনে হয় না। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদকে আওয়ামী লীগ মানবে না। আলাকিত মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকেও সবাই শ্রদ্ধা করেন। যদিও সম্প্রতি তার একটি বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মহাজোটের সংসদ সদস্যরা সংসদে বেশ সমালোচনা করেছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও সর্বজন শ্রদ্ধেয়।
শিক্ষকদের বাইরে নাগরিক সমাজের মধ্য থেকে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাকে নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নেই। ড. ইউনূসকে নিয়ে অবশ্য খোদ প্রধানমন্ত্রীরই আপত্তি আছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার ইমেজ সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বিএনপি মনে করে তিনি যেহেতু ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যেহেতু হেরে গেছে, তাই দলটি তার সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
তবে এ সবই ধারণা। শেষমেষ হয়তো রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে কেউ একজন, আরও পরিষ্কার করে বললে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ অথবা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মধ্য থেকে কেউ একজনই দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। এটি এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।
আমীন আল রশীদ: লেখক ও সাংবাদিক
‘ইন্নালিল্লাহ’ এবং ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি
শওকত মাহমুদ
ভরদুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছি। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের
মৃত্যু সংবাদটি প্রথমে দেখলাম ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’ টিভির টিকারে। অর্থাৎ পর্দার
নিচে চলমান শিরোনামে, ব্রেকিং নিউজ হিসেবে। চমকে উঠলাম খবরের গুরুত্বে এবং
অসম্পূর্ণতায়। সাংবাদিকতার একজন ছাত্র এবং পাঠক হিসেবে আমি খুঁজতে থাকি
কবে কখন রাষ্ট্রপতি ইন্তেকাল করেছেন। সিঙ্গাপুরে তিনি গুরুতর অসুস্থ
অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সে খবর সবাই জানে। তবে দু’দিন যাবৎ কোনো খবর মিডিয়ায়
আসছিল না। কিন্তু মৃত্যু সংবাদে মৃত্যুক্ষণটির উল্লেখ ছিল না। আর
‘ইন্তেকাল’ শব্দটির বদলে ‘মারা গেছেন’ বলা হয়েছে—এতে আমি আশ্চর্য হই না।
কেননা ‘মারা গেছেন’ শব্দটি বেশি সহজসাধ্য এবং মান্য বাংলা। কিন্তু কোনো
মুসলমান মারা গেলে খবরটির শেষে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’-এ
বাক্যটি আমরা সবসময় উল্লেখ করি। কিন্তু সেদিন দেখলাম না। এক টেবিলেই বসা
ছিলেন ‘সমকাল’ সম্পাদক সফল সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার। তার মনোযোগ আকর্ষণ
করতেই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’সহ কয়েকটি টিভি শোক-সংবাদে
‘ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন’ উল্লেখ করে না। সাংবাদিকতার যা অবস্থা হয়েছে!
বাকি টিভিগুলোর নাম তিনি বললেন না, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম বর্তমান
সরকারের আমলে লাইসেন্স পাওয়া টিভিগুলো আমাদের এই সর্বমান্য রীতিকে বিসর্জন
দিয়ে চলেছে। বলাই বাহুল্য, শাহবাগি জাগরণ নিয়ে এসব টিভি ছিল সোচ্চার।‘ইন্নালিল্লাহ’ বলতে ইন্ডিপেনডেন্টের নাস্তিকতা শিউরে উঠবে-আমি একথা বিশ্বাস করি না। এর মালিক শ্মশ্রুমণ্ডিত এবং নিশ্চয়ই ধর্মপ্রাণ সালমান রহমান এমন নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন বলে মনে হয় না। কিন্তু দায় তো তারই। বার্তাপ্রধান খালেদ মুহীউদ্দিন বা টিকার-লেখক এ কাজটি আচম্বিতে করেছেন তাও মনে করি না। কিন্তু স্টেশনটির সম্পাদকীয় নীতিতে এটি সাব্যস্ত হয়ে আছে কীভাবে? ‘ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, এ মানুষটি নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য ছিলেন এবং নিশ্চয়ই তাকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
জিল্লুর রহমান ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর কাছেই তিনি ফেরত যাবেন-খোদ জিল্লুর রহমানের আত্মা একথা বলছে। অতএব তিনি আল্লাহর বান্দা ছিলেন, একথাটুকু দিয়ে তার মৃত্যুকে সম্মানিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান রহমানদের কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। রাষ্ট্রপতির ছেলে বেক্সিমকো গ্রুপের একজন অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপতি নিশ্চয়ই বেক্সিমকো গ্রুপকে নানাভাবে সহায়তা করে থাকতে পারেন। আমার মতে, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি বলে পরিচিত এবং শেখ পরিবারের প্রতি রাজনৈতিকভাবে চিরঅনুগত জিল্লুর রহমানের ভালো-মন্দ নিয়ে বলার অনেক কিছু আছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করে দেয়া এবং বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে ফের আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাকে অসম্মানিত করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তার মৃত্যু কবে হয়েছে, ঘোষণায় কোনো বিলম্ব আছে কিনা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী, সরাসরি সম্প্রচারে বিটিভির ব্যর্থতা, সরকারি ছুটির আকস্মিক ঘোষণা এবং শোকের কর্মসূচিতে পরিবর্তনের পেছনে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন জন্ম নিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আর বঙ্গভবনে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দৃশ্যমান উপেক্ষা শেখ হাসিনার জন্য গণনিন্দাই বয়ে এনেছে।
গণমাধ্যমের এই ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘ইন্নালিল্লাহ’ বর্জনের পেছনে রাজনীতি কাজ করেছে বলে সাধারণ মানুষ সংশয় প্রকাশ করতে পারেন। শাহবাগে কতিপয় নাস্তিক ব্লগারের হম্বিতম্বি এবং সাংস্কৃতিক আচরণ বাংলাদেশের মিডিয়াতেও প্রভাব ফেলেছে। আগে বলতাম ‘নিপাত যাক’। ভদ্র ভাষায় যার অর্থ কারও পতন বা বিদায় চাই। এখন বলছে ‘জবাই’। শব্দটি আরবি থেকে যা ইসলামী রীতি-নীতি অনুযায়ী হবে। কিন্তু ডাকাত মানুষের গলা কাটলেও মিডিয়া বলে ফেলে জবাই। মুক্তিযুদ্ধ এবং ইসলামকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানোর অপপ্রয়াস থেকে ওই শব্দের ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার। পাঠ্যবইতে ‘জবাই’ ও ‘বলি’কে কমিউনিস্ট শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একাকার করে ফেলেছেন। অত্যন্ত ভদ্র এই শিক্ষামন্ত্রীর আমলে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি প্রাণ, রক্ত ঝরেছে। সন্ত্রাস সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ক্লাস সবচেয়ে বেশিদিন বন্ধ থেকেছে এবং অনির্বাচিত ভিসিরা রাজত্ব করে গেছেন।
মিডিয়ায় শব্দ বা অভিধা প্রয়োগে সতর্কতা পালন করতে হয়। কেননা, এর ভাষা জনবয়ান গড়ে তোলে, নতুন নতুন শব্দ অভিধানে ঢোকায় এবং অভিধার মধ্যেও রাজনীতি আছে। যেমন জামায়াত-শিবিরের নামের সঙ্গে ‘তাণ্ডব’ তৈরি করেছে এক শ্রেণীর মিডিয়া। গণহত্যায় মেতে ওঠা ‘পুলিশ’ শব্দটির সঙ্গে ‘ঘাতক’ যোগ হয়নি। শাহবাগিরা ছাগল-দাড়ির মতো মানুষজনকে ‘ছাগু’ নামে বলা চালু করেছে। ‘রাজাকার’ মানে দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক।
‘মাদক বা তামুককে না বলুন’ এসব স্লোগানের জন্ম দেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট কট্টরপন্থী রোনাল্ড রিগ্যানের স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যান। তিনি ‘মাদকের বিরুদ্ধে না বলুন’ স্লোগান চালু করেন। পরিবেশবাদী আন্দোলন তথা ‘গাছ লাগান’ আন্দোলনের মূল প্রবতর্ক হিটলার। মানবেতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য এই যুদ্ধাপরাধীর উত্তরণ সুশীল সমাজ থেকে এবং তিনি বুকের দুধ খাওয়ানোর বড় প্রবক্তা ছিলেন। তখন হিটলার করেছেন বলে আমরা কি বাদ দেব? যেমন জামায়াত-শিবিরের সবকিছু পরিত্যাজ্য-এই আন্দোলনের বিষয়ে এক টিভি স্টেশন মালিকের প্রশ্ন-ওরা তো নামাজ পড়ে, তাহলে আমরা কি নামাজ পড়া বাদ দেব? ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ শব্দটা এসেছে মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদ সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে, যারা নিজেদের ‘অ্যাক্টিভিস্ট ফিলোসফার’ হিসেবে দাবি করতেন।
যা হোক, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকা ও ভাষা নিয়ে আজ অনেকেই উদ্বিগ্ন। ২০০৭ সালের শুরুতে কলকাতার বইমেলায় একটা বই বেরিয়েছিল। নাম-সম্প্রচারের ভাষা ও ভঙ্গি। সম্পাদক ভবেশ দাস-আকাশবাণীতে সাংবাদিকতা করেছেন। ‘ভাষার গতি আছে, সে-গতি প্রগতির পথেই চলবে’-এটাই তো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এই ধ্বনিঝঙ্কার ও বাক-বিস্ফোরণে ভাষার দুর্গতি-চিন্তায় (সম্ভবত অধোগতি নয়) অনেকেই উদ্বিগ্ন। বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস ও ভাষার প্রকাশভঙ্গি নিয়ে মন খারাপ করেন কেউ কেউ-এটি সম্পাদকের বক্তব্য।
মন খারাপ করব না কেন, গত শনিবার এক মাওলানা, সরকারের ধর্ম-দিশারী, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এক মহাসমাবেশ ডেকেছিলেন। তাতে কয়েকশ’ লোককে জড়ো থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সরকার-অনুগত ওইসব মিডিয়া লোকসংখ্যা বলল না, মহাসমাবেশ বলেই গেল। আর এ প্রশ্নটি তুলল না যে, রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্যে ওই মাওলানা সাহেব এ কাজটি কেমন করে করলেন? অথচ তখন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চলছিল মরহুম রাষ্ট্রপতির জন্য মিলাদ। সরকারের বিরুদ্ধে অন্য গ্রুপের মুসল্লিরা এমনটি করলে তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারসহ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতারও করা হতো।
সরকার বা আপন বিশ্বাসের লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকতায় নতুন ঘটনা নয়। এক দল বলে, এক ধরনের গণমাধ্যম তাদের বৃত্তিতে যেকোনো ধরনের ইসলামিকতাকে বর্জনে মৌলবাদীদের মতো, আরেক গ্রুপ অতিমাত্রায় ধর্মীয় সত্তার বিস্ফোরণ ঘটাতে চায় অকারণেই। এই দ্বন্দ্ব আজকের নয়। কিন্তু এমন লড়াইয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ পর্যন্ত বর্জন করার প্রবৃত্তি আমাদের আঘাত দেয়। বিবি আয়েশার যুদ্ধের চাইতে জোয়ান অব আর্কের যুদ্ধ রেফারেন্সে বেশি চলে আসে। বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিশালী ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় ওই বইতে ‘খবর বলছি...’ শীর্ষক নিবন্ধে সাংবাদিকতায় সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “১৯৩৬-এর ‘ভারত শাসন আইন’ অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার ভিত্তিতে ১৯৩৭-এর জানুয়ারিতে প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম ভোট থেকে বাংলা কাগজগুলির ভেতরের এসব রাজনীতির সূক্ষ্ম ভাগাভাগি মুছে গেল। সব কাগজই তারস্বরে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িকতার জিভও ছিল সাম্প্রদায়িকতার মতো কাটা। তার এক ডগা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত, আর এক ডগা তফসিলি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত। এই দুই শত্রুর কাছে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ এত তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল যে আগস্ট আন্দোলনের খবরও এসব কাগজে যথেষ্ট কম বেরুত। হিন্দু কাগজগুলির এই সাম্প্রদায়িকতার প্রতিক্রিয়ায় ও মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক স্বাধিকারের আন্দোলনের প্রয়োজনে ‘আজাদ’ ও ‘ইত্তেহাদ’ কাগজ দুটি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার পোষকতা শুরু করে। বাংলা খবরের কাগজে বাঙালি যে বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল, তার জায়গায় নতুন এই বাঙালি বৈশিষ্ট্য এলো-চিৎকৃত সাম্প্রদায়িকতা। ১৯৪০ থেকে প্রায় ১৯৭০ পর্যন্তই এই বিদ্বিষ্ট, চিৎকৃত, বিকারগ্রস্ত ও অপ্রমাণিত সংবাদনির্ভর সাংবাদিকতা বাংলার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।”
আজ বাংলাদেশে কি এমন সাংবাদিকতা হচ্ছে না? যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জাতিতে বিভক্তি, পুলিশের বর্বরতাকে আদুরে সমর্থন, গণতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করে মারার মচ্ছব কি একশ্রেণীর মিডিয়া করছে না? ‘টেলিভিশনে বুদ্ধিজীবী’ নামে প্রবন্ধটি আলোচ্য গ্রন্থে সঙ্কলিত। লেখক প্রদীপ বসু। বলছেন, “প্রকৃত চিন্তা মানুষের মনকে নাড়া দেয়, তাকে ভাবতে বাধ্য করে। টেলিভিশন যে প্রতিযোগিতা ও কর্মপ্রক্রিয়ার মডেল অনুসরণ করে তাতে এরকম হওয়ার কোনো আশা নেই...আমরা সর্বক্ষণ দেখতে পাই টক শো’র হোস্ট, খবর পরিবেশনের অ্যাঙ্কর, ক্রিকেটের বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকার জ্যাঠামশায়ের মতো নীতি উপদেশ দিয়ে চলেছেন। এরা সকলেই হয়ে পড়েছেন দর্শকের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা, মধ্যবিত্ত নৈতিকতার প্রতিনিধি। এরা সকলেই আমাদের বলছেন ‘সামাজিক সমস্যা’ সম্পর্কে আমাদের কী ‘ভাবা উচিত’। আগেই বলেছি এই মানবিক কৌতূহল-জাগানো গল্প, নৈতিক উপদেশ এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি করে। এই গল্পগুলি শুধুমাত্র অরাজনীতিকরণেরই সাহায্য করে না, ঘটনাবলীকে কিসসা বা চুটকির স্তরে নামিয়ে আনে। এইসব গল্পের কোনো রাজনৈতিক পরিণাম থাকে না। কিন্তু এইসব গল্পকে এক নাটকীয় চেহারা দেওয়া হয়। যার থেকে আমরা ‘শিক্ষা নিতে পারি’ অথবা ঘটনাগুলিকে ‘সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে সম্প্রচার করা হয়। এইসব ক্ষেত্রেই আমাদের চটজলদি বুদ্ধিজীবী বা টিভি দার্শনিকদের ডাক পড়ে, যাতে তারা অর্থহীনকে অর্থ প্রদান করতে পারেন, চুটকি কিস্সা যেগুলিকে কৃত্রিমভাবে মঞ্চে আনা হয়েছে তাদের একটা সুসংগত রূপ দিতে পারেন।”
এক ‘ইন্নালিল্লাহ’-এর জন্য হয়তো বেশি বলে ফেললাম। আমাদের চিন্তা-চেতনার জগৎই কেমন সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। সাংবাদিক ক্রিস হেজ তার সুলিখিত বই ‘ডেথ অব দ্য লিবারেল ক্লাস’-এ বলছেন, আমাদের চিন্তন প্রক্রিয়ার, সৃষ্টিশীলতার প্রবাহে বাধা তৈরি হয়েছে মুদ্রন মাধ্যমের বদলে ভিসুয়াল মিডিয়ার (টিভি, কম্পিউটার) আধিক্য বেড়ে যাওয়ায়। ফেসবুকে লিখতে ব্যাকরণ দরকার নেই। পছন্দের সঙ্গীরা হড়হড় করে হাজির হবে। আধুনিকতা মানেই যেন ঐতিহ্য, আবহমান সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলা। টক শো’র পিতৃপ্রতিম আলোচককে আজকের তরুণ হোস্ট ‘জনাব’ ব্যতিরেকে শুধু নাম ধরে সম্বোধন না করলে আধুনিকতা বা আন্তর্জাতিকতাই থাকে না।
মাঝে-মধ্যে ভাবি, আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তা, আলোকিত উপলব্ধি, ব্যাকরণ, নৈতিকতা আর সুস্থ পঠন-পাঠনের কী দুরন্ত গতিধারাই না ছিল। তর্ক-বিতর্ক ছিল, ধর্ম ও আধুনিকতার কী যুক্তিগ্রাহ্য মিশেলই না লক্ষ করেছি। এই ধরুন, একসময় সংবাদপত্রের শোক সংবাদে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কথাটি পুরো লেখা হবে কী হবে না, তা নিয়ে আলেম সমাজ এবং একসময়ের বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক বাংলা’ ও ‘ইত্তেফাক’-এর মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। আলেম সমাজ একসময় মেনে নিয়েছিল, পুরো কথা না লিখে সংক্ষেপে লিখলেও চলবে। কিন্তু সাংবাদিকদের কখনও বলেনি, এটা একদমই লিখব না। কেননা, মূল্যবোধের গভীরতম স্থানগুলো সম্পর্কে সাংবাদিকরা বরাবরই সচেতন এবং মান্য করে এসেছে। কিন্তু আজ? মালিক ও সাংবাদিকদের চরিত্রে এ কোন্ অপছায়া?
শওকত মাহমুদ: প্রখ্যাত সাংবাদিক; মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।
Subscribe to:
Posts (Atom)
