Tuesday, March 26, 2013
তৃতীয় কারো রাষ্ট্রপতি হবার সম্ভাবনা কতটুকু?
আমীন আল রশীদ
মো. জিল্লুর রহমানের পরে দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- এ নিয়ে সব মহলেই আলোচনা এবং জল্পনা-কল্পনা চলছে। তবে সেই আলোচনা এখন পর্যন্ত দুজন ব্যক্তিকে ঘিরে। একজন জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, যিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন এবং অন্যজন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। এর বাইরে তৃতীয় আর কারোর সম্ভাবনা কতটুকু?
যে দুজনকে নিয়ে আলোচনা চলছে, জনমত নিলে তাদের মধ্যে আবদুল হামিদের পক্ষেই বেশি মানুষ বলবেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, যিনি এখনও রাষ্টপ্রতি হবার স্বপ্ন দেখেন, তিনিও গণমাধ্যমে বলেছেন, আবদুল হামিদ যদি রাষ্ট্রপতি হন, সেটিই মঙ্গলজনক হবে। তবে শোনা যাচ্ছে সাজেদা চৌধুরীর পক্ষেও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মতামত প্রবল।
তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। আর তা হলো জিল্লুর রহমানের পরে যিনিই রাষ্টপ্রতি নির্বাচিত হন না কেন, সংবিধান অনুযায়ী তিনি পরবর্তী পাঁচ বছর স্বীয় পদে থাকবেন, যদি না তিনি স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদ যদি তাকে ইমপিচ বা অভিশংসন না করে। সেক্ষেত্রেও জটিলতা আছে। রাষ্টপ্রতিকে ইমপিচ করতে চাইলে সংসদের দুই তৃতীয়াংশের ভোট লাগবে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, প্রধান দুই দলের নেত্রীদ্বয় যদি একত্রে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন, সেটি সবচেয়ে মঙ্গল। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হকও বঙ্গভবনে গণমাধ্যমকে এ কথা বলেছেন। যদিও সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বিশেষজ্ঞরা মূলত যে কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বড় দুই দলের ঐকমত্য চাচ্ছেন, সেটি হলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবার কথা। সেই নির্বাচন কোন ধরণের সরকারের অধীনে হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। বিরোধী দল স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ প্রথমে যদিও বলেছিল যে, উন্নত দেশে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট তার পদে থাকা অবস্থায়ই নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেরকম হবে। কিন্তু পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন যে, নির্বাচনের আগে তিনি রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দিতে বলবেন এবং নির্বাচন কমিশনকে তফসিল ঘোষণা করার পরামর্শ দেবেন।
তার মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি যিনিই হোন না কেন আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তাকে বেশ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি যদি বড় দুই দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তি হন এবং নির্বাচনের আগে যদি তার নেতৃত্বে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা যায়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে কারণেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে এবার রাষ্ট্রপতি করা যায়।
প্রশ্ন হলো সেরকম ব্যক্তির সংখ্যা কত? সর্বজন শ্রদ্ধেয়, বিতর্কের ঊর্ধ্বে এবং রাষ্ট্রপতি হবার যোগ্যতা আছে, এরকম ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করতে গেলে সেই তালিকা খুব দীর্ঘ হবে না। তবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। যতটা আন্দাজ করা যায় তার ব্যাপারে কেউ আপত্তি তুলবে না। ব্যারিস্টার রফিকুল হকের নামও বলা যায়। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন। কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতিও এই তালিকায় আসতে পারেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালকে নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
একবার শোনা গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিকও রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। কিন্তু বিএনপি তাকে মানবে বলে মনে হয় না। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদকে আওয়ামী লীগ মানবে না। আলাকিত মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকেও সবাই শ্রদ্ধা করেন। যদিও সম্প্রতি তার একটি বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মহাজোটের সংসদ সদস্যরা সংসদে বেশ সমালোচনা করেছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও সর্বজন শ্রদ্ধেয়।
শিক্ষকদের বাইরে নাগরিক সমাজের মধ্য থেকে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তাকে নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নেই। ড. ইউনূসকে নিয়ে অবশ্য খোদ প্রধানমন্ত্রীরই আপত্তি আছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার ইমেজ সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বিএনপি মনে করে তিনি যেহেতু ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যেহেতু হেরে গেছে, তাই দলটি তার সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানও সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।
তবে এ সবই ধারণা। শেষমেষ হয়তো রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে কেউ একজন, আরও পরিষ্কার করে বললে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ অথবা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মধ্য থেকে কেউ একজনই দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। এটি এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।
আমীন আল রশীদ: লেখক ও সাংবাদিক
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment