শওকত মাহমুদ
ভরদুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছি। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের
মৃত্যু সংবাদটি প্রথমে দেখলাম ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’ টিভির টিকারে। অর্থাৎ পর্দার
নিচে চলমান শিরোনামে, ব্রেকিং নিউজ হিসেবে। চমকে উঠলাম খবরের গুরুত্বে এবং
অসম্পূর্ণতায়। সাংবাদিকতার একজন ছাত্র এবং পাঠক হিসেবে আমি খুঁজতে থাকি
কবে কখন রাষ্ট্রপতি ইন্তেকাল করেছেন। সিঙ্গাপুরে তিনি গুরুতর অসুস্থ
অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সে খবর সবাই জানে। তবে দু’দিন যাবৎ কোনো খবর মিডিয়ায়
আসছিল না। কিন্তু মৃত্যু সংবাদে মৃত্যুক্ষণটির উল্লেখ ছিল না। আর
‘ইন্তেকাল’ শব্দটির বদলে ‘মারা গেছেন’ বলা হয়েছে—এতে আমি আশ্চর্য হই না।
কেননা ‘মারা গেছেন’ শব্দটি বেশি সহজসাধ্য এবং মান্য বাংলা। কিন্তু কোনো
মুসলমান মারা গেলে খবরটির শেষে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’-এ
বাক্যটি আমরা সবসময় উল্লেখ করি। কিন্তু সেদিন দেখলাম না। এক টেবিলেই বসা
ছিলেন ‘সমকাল’ সম্পাদক সফল সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার। তার মনোযোগ আকর্ষণ
করতেই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’সহ কয়েকটি টিভি শোক-সংবাদে
‘ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন’ উল্লেখ করে না। সাংবাদিকতার যা অবস্থা হয়েছে!
বাকি টিভিগুলোর নাম তিনি বললেন না, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম বর্তমান
সরকারের আমলে লাইসেন্স পাওয়া টিভিগুলো আমাদের এই সর্বমান্য রীতিকে বিসর্জন
দিয়ে চলেছে। বলাই বাহুল্য, শাহবাগি জাগরণ নিয়ে এসব টিভি ছিল সোচ্চার।‘ইন্নালিল্লাহ’ বলতে ইন্ডিপেনডেন্টের নাস্তিকতা শিউরে উঠবে-আমি একথা বিশ্বাস করি না। এর মালিক শ্মশ্রুমণ্ডিত এবং নিশ্চয়ই ধর্মপ্রাণ সালমান রহমান এমন নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন বলে মনে হয় না। কিন্তু দায় তো তারই। বার্তাপ্রধান খালেদ মুহীউদ্দিন বা টিকার-লেখক এ কাজটি আচম্বিতে করেছেন তাও মনে করি না। কিন্তু স্টেশনটির সম্পাদকীয় নীতিতে এটি সাব্যস্ত হয়ে আছে কীভাবে? ‘ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, এ মানুষটি নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য ছিলেন এবং নিশ্চয়ই তাকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
জিল্লুর রহমান ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন এবং আল্লাহর কাছেই তিনি ফেরত যাবেন-খোদ জিল্লুর রহমানের আত্মা একথা বলছে। অতএব তিনি আল্লাহর বান্দা ছিলেন, একথাটুকু দিয়ে তার মৃত্যুকে সম্মানিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান রহমানদের কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয়। রাষ্ট্রপতির ছেলে বেক্সিমকো গ্রুপের একজন অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রপতি নিশ্চয়ই বেক্সিমকো গ্রুপকে নানাভাবে সহায়তা করে থাকতে পারেন। আমার মতে, অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি বলে পরিচিত এবং শেখ পরিবারের প্রতি রাজনৈতিকভাবে চিরঅনুগত জিল্লুর রহমানের ভালো-মন্দ নিয়ে বলার অনেক কিছু আছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষমা করে দেয়া এবং বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে ফের আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাকে অসম্মানিত করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তার মৃত্যু কবে হয়েছে, ঘোষণায় কোনো বিলম্ব আছে কিনা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী, সরাসরি সম্প্রচারে বিটিভির ব্যর্থতা, সরকারি ছুটির আকস্মিক ঘোষণা এবং শোকের কর্মসূচিতে পরিবর্তনের পেছনে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন জন্ম নিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আর বঙ্গভবনে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের দৃশ্যমান উপেক্ষা শেখ হাসিনার জন্য গণনিন্দাই বয়ে এনেছে।
গণমাধ্যমের এই ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ‘ইন্নালিল্লাহ’ বর্জনের পেছনে রাজনীতি কাজ করেছে বলে সাধারণ মানুষ সংশয় প্রকাশ করতে পারেন। শাহবাগে কতিপয় নাস্তিক ব্লগারের হম্বিতম্বি এবং সাংস্কৃতিক আচরণ বাংলাদেশের মিডিয়াতেও প্রভাব ফেলেছে। আগে বলতাম ‘নিপাত যাক’। ভদ্র ভাষায় যার অর্থ কারও পতন বা বিদায় চাই। এখন বলছে ‘জবাই’। শব্দটি আরবি থেকে যা ইসলামী রীতি-নীতি অনুযায়ী হবে। কিন্তু ডাকাত মানুষের গলা কাটলেও মিডিয়া বলে ফেলে জবাই। মুক্তিযুদ্ধ এবং ইসলামকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানোর অপপ্রয়াস থেকে ওই শব্দের ব্যঙ্গাত্মক ব্যবহার। পাঠ্যবইতে ‘জবাই’ ও ‘বলি’কে কমিউনিস্ট শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একাকার করে ফেলেছেন। অত্যন্ত ভদ্র এই শিক্ষামন্ত্রীর আমলে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি প্রাণ, রক্ত ঝরেছে। সন্ত্রাস সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ক্লাস সবচেয়ে বেশিদিন বন্ধ থেকেছে এবং অনির্বাচিত ভিসিরা রাজত্ব করে গেছেন।
মিডিয়ায় শব্দ বা অভিধা প্রয়োগে সতর্কতা পালন করতে হয়। কেননা, এর ভাষা জনবয়ান গড়ে তোলে, নতুন নতুন শব্দ অভিধানে ঢোকায় এবং অভিধার মধ্যেও রাজনীতি আছে। যেমন জামায়াত-শিবিরের নামের সঙ্গে ‘তাণ্ডব’ তৈরি করেছে এক শ্রেণীর মিডিয়া। গণহত্যায় মেতে ওঠা ‘পুলিশ’ শব্দটির সঙ্গে ‘ঘাতক’ যোগ হয়নি। শাহবাগিরা ছাগল-দাড়ির মতো মানুষজনকে ‘ছাগু’ নামে বলা চালু করেছে। ‘রাজাকার’ মানে দাড়ি-টুপিওয়ালা লোক।
‘মাদক বা তামুককে না বলুন’ এসব স্লোগানের জন্ম দেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট কট্টরপন্থী রোনাল্ড রিগ্যানের স্ত্রী ন্যান্সি রিগ্যান। তিনি ‘মাদকের বিরুদ্ধে না বলুন’ স্লোগান চালু করেন। পরিবেশবাদী আন্দোলন তথা ‘গাছ লাগান’ আন্দোলনের মূল প্রবতর্ক হিটলার। মানবেতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য এই যুদ্ধাপরাধীর উত্তরণ সুশীল সমাজ থেকে এবং তিনি বুকের দুধ খাওয়ানোর বড় প্রবক্তা ছিলেন। তখন হিটলার করেছেন বলে আমরা কি বাদ দেব? যেমন জামায়াত-শিবিরের সবকিছু পরিত্যাজ্য-এই আন্দোলনের বিষয়ে এক টিভি স্টেশন মালিকের প্রশ্ন-ওরা তো নামাজ পড়ে, তাহলে আমরা কি নামাজ পড়া বাদ দেব? ‘অ্যাক্টিভিস্ট’ শব্দটা এসেছে মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদ সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে, যারা নিজেদের ‘অ্যাক্টিভিস্ট ফিলোসফার’ হিসেবে দাবি করতেন।
যা হোক, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকা ও ভাষা নিয়ে আজ অনেকেই উদ্বিগ্ন। ২০০৭ সালের শুরুতে কলকাতার বইমেলায় একটা বই বেরিয়েছিল। নাম-সম্প্রচারের ভাষা ও ভঙ্গি। সম্পাদক ভবেশ দাস-আকাশবাণীতে সাংবাদিকতা করেছেন। ‘ভাষার গতি আছে, সে-গতি প্রগতির পথেই চলবে’-এটাই তো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এই ধ্বনিঝঙ্কার ও বাক-বিস্ফোরণে ভাষার দুর্গতি-চিন্তায় (সম্ভবত অধোগতি নয়) অনেকেই উদ্বিগ্ন। বানান, শব্দের প্রয়োগ, বাক্যবিন্যাস ও ভাষার প্রকাশভঙ্গি নিয়ে মন খারাপ করেন কেউ কেউ-এটি সম্পাদকের বক্তব্য।
মন খারাপ করব না কেন, গত শনিবার এক মাওলানা, সরকারের ধর্ম-দিশারী, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এক মহাসমাবেশ ডেকেছিলেন। তাতে কয়েকশ’ লোককে জড়ো থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সরকার-অনুগত ওইসব মিডিয়া লোকসংখ্যা বলল না, মহাসমাবেশ বলেই গেল। আর এ প্রশ্নটি তুলল না যে, রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্যে ওই মাওলানা সাহেব এ কাজটি কেমন করে করলেন? অথচ তখন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চলছিল মরহুম রাষ্ট্রপতির জন্য মিলাদ। সরকারের বিরুদ্ধে অন্য গ্রুপের মুসল্লিরা এমনটি করলে তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারসহ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতারও করা হতো।
সরকার বা আপন বিশ্বাসের লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকতায় নতুন ঘটনা নয়। এক দল বলে, এক ধরনের গণমাধ্যম তাদের বৃত্তিতে যেকোনো ধরনের ইসলামিকতাকে বর্জনে মৌলবাদীদের মতো, আরেক গ্রুপ অতিমাত্রায় ধর্মীয় সত্তার বিস্ফোরণ ঘটাতে চায় অকারণেই। এই দ্বন্দ্ব আজকের নয়। কিন্তু এমন লড়াইয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ পর্যন্ত বর্জন করার প্রবৃত্তি আমাদের আঘাত দেয়। বিবি আয়েশার যুদ্ধের চাইতে জোয়ান অব আর্কের যুদ্ধ রেফারেন্সে বেশি চলে আসে। বাংলা ভাষার অন্যতম শক্তিশালী ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় ওই বইতে ‘খবর বলছি...’ শীর্ষক নিবন্ধে সাংবাদিকতায় সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “১৯৩৬-এর ‘ভারত শাসন আইন’ অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার ভিত্তিতে ১৯৩৭-এর জানুয়ারিতে প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম ভোট থেকে বাংলা কাগজগুলির ভেতরের এসব রাজনীতির সূক্ষ্ম ভাগাভাগি মুছে গেল। সব কাগজই তারস্বরে সাম্প্রদায়িক হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িকতার জিভও ছিল সাম্প্রদায়িকতার মতো কাটা। তার এক ডগা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত, আর এক ডগা তফসিলি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষ ছড়াত। এই দুই শত্রুর কাছে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ এত তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল যে আগস্ট আন্দোলনের খবরও এসব কাগজে যথেষ্ট কম বেরুত। হিন্দু কাগজগুলির এই সাম্প্রদায়িকতার প্রতিক্রিয়ায় ও মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক স্বাধিকারের আন্দোলনের প্রয়োজনে ‘আজাদ’ ও ‘ইত্তেহাদ’ কাগজ দুটি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার পোষকতা শুরু করে। বাংলা খবরের কাগজে বাঙালি যে বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল, তার জায়গায় নতুন এই বাঙালি বৈশিষ্ট্য এলো-চিৎকৃত সাম্প্রদায়িকতা। ১৯৪০ থেকে প্রায় ১৯৭০ পর্যন্তই এই বিদ্বিষ্ট, চিৎকৃত, বিকারগ্রস্ত ও অপ্রমাণিত সংবাদনির্ভর সাংবাদিকতা বাংলার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।”
আজ বাংলাদেশে কি এমন সাংবাদিকতা হচ্ছে না? যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জাতিতে বিভক্তি, পুলিশের বর্বরতাকে আদুরে সমর্থন, গণতন্ত্রকে শ্বাসরোধ করে মারার মচ্ছব কি একশ্রেণীর মিডিয়া করছে না? ‘টেলিভিশনে বুদ্ধিজীবী’ নামে প্রবন্ধটি আলোচ্য গ্রন্থে সঙ্কলিত। লেখক প্রদীপ বসু। বলছেন, “প্রকৃত চিন্তা মানুষের মনকে নাড়া দেয়, তাকে ভাবতে বাধ্য করে। টেলিভিশন যে প্রতিযোগিতা ও কর্মপ্রক্রিয়ার মডেল অনুসরণ করে তাতে এরকম হওয়ার কোনো আশা নেই...আমরা সর্বক্ষণ দেখতে পাই টক শো’র হোস্ট, খবর পরিবেশনের অ্যাঙ্কর, ক্রিকেটের বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকার জ্যাঠামশায়ের মতো নীতি উপদেশ দিয়ে চলেছেন। এরা সকলেই হয়ে পড়েছেন দর্শকের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা, মধ্যবিত্ত নৈতিকতার প্রতিনিধি। এরা সকলেই আমাদের বলছেন ‘সামাজিক সমস্যা’ সম্পর্কে আমাদের কী ‘ভাবা উচিত’। আগেই বলেছি এই মানবিক কৌতূহল-জাগানো গল্প, নৈতিক উপদেশ এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি করে। এই গল্পগুলি শুধুমাত্র অরাজনীতিকরণেরই সাহায্য করে না, ঘটনাবলীকে কিসসা বা চুটকির স্তরে নামিয়ে আনে। এইসব গল্পের কোনো রাজনৈতিক পরিণাম থাকে না। কিন্তু এইসব গল্পকে এক নাটকীয় চেহারা দেওয়া হয়। যার থেকে আমরা ‘শিক্ষা নিতে পারি’ অথবা ঘটনাগুলিকে ‘সামাজিক সমস্যা’ হিসেবে সম্প্রচার করা হয়। এইসব ক্ষেত্রেই আমাদের চটজলদি বুদ্ধিজীবী বা টিভি দার্শনিকদের ডাক পড়ে, যাতে তারা অর্থহীনকে অর্থ প্রদান করতে পারেন, চুটকি কিস্সা যেগুলিকে কৃত্রিমভাবে মঞ্চে আনা হয়েছে তাদের একটা সুসংগত রূপ দিতে পারেন।”
এক ‘ইন্নালিল্লাহ’-এর জন্য হয়তো বেশি বলে ফেললাম। আমাদের চিন্তা-চেতনার জগৎই কেমন সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। সাংবাদিক ক্রিস হেজ তার সুলিখিত বই ‘ডেথ অব দ্য লিবারেল ক্লাস’-এ বলছেন, আমাদের চিন্তন প্রক্রিয়ার, সৃষ্টিশীলতার প্রবাহে বাধা তৈরি হয়েছে মুদ্রন মাধ্যমের বদলে ভিসুয়াল মিডিয়ার (টিভি, কম্পিউটার) আধিক্য বেড়ে যাওয়ায়। ফেসবুকে লিখতে ব্যাকরণ দরকার নেই। পছন্দের সঙ্গীরা হড়হড় করে হাজির হবে। আধুনিকতা মানেই যেন ঐতিহ্য, আবহমান সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলা। টক শো’র পিতৃপ্রতিম আলোচককে আজকের তরুণ হোস্ট ‘জনাব’ ব্যতিরেকে শুধু নাম ধরে সম্বোধন না করলে আধুনিকতা বা আন্তর্জাতিকতাই থাকে না।
মাঝে-মধ্যে ভাবি, আমাদের সমাজে মুক্তচিন্তা, আলোকিত উপলব্ধি, ব্যাকরণ, নৈতিকতা আর সুস্থ পঠন-পাঠনের কী দুরন্ত গতিধারাই না ছিল। তর্ক-বিতর্ক ছিল, ধর্ম ও আধুনিকতার কী যুক্তিগ্রাহ্য মিশেলই না লক্ষ করেছি। এই ধরুন, একসময় সংবাদপত্রের শোক সংবাদে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কথাটি পুরো লেখা হবে কী হবে না, তা নিয়ে আলেম সমাজ এবং একসময়ের বহুল প্রচারিত ‘দৈনিক বাংলা’ ও ‘ইত্তেফাক’-এর মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। আলেম সমাজ একসময় মেনে নিয়েছিল, পুরো কথা না লিখে সংক্ষেপে লিখলেও চলবে। কিন্তু সাংবাদিকদের কখনও বলেনি, এটা একদমই লিখব না। কেননা, মূল্যবোধের গভীরতম স্থানগুলো সম্পর্কে সাংবাদিকরা বরাবরই সচেতন এবং মান্য করে এসেছে। কিন্তু আজ? মালিক ও সাংবাদিকদের চরিত্রে এ কোন্ অপছায়া?
শওকত মাহমুদ: প্রখ্যাত সাংবাদিক; মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।

No comments:
Post a Comment